ঘর ছিল, উঠান ছিল, ছিল বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সংসার। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নও ছিল। কিন্তু তিস্তার একের পর এক আঘাতে সেই সবকিছু এখন শুধুই স্মৃতি। মাত্র কয়েক দিনের ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের চর নোহালী কাচারিপাড়া এলাকায় ১১টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে প্রায় ৫০ একর আবাদি জমিও। এখন নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছেন আরও শতাধিক পরিবার—কখন তাদের ঘরটিও তিস্তার গর্ভে তলিয়ে যায়।
স্থানীয়দের স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত একটি অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ভাঙন। প্রতিদিন একটু একটু করে নদী গিলে খাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি আর মানুষের আজীবনের সঞ্চয়। পুরো এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক পরিবার নিজেদের ঘরের টিন, কাঠ, দরজা-জানালা, এমনকি ইট পর্যন্ত খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ ট্রলিতে, কেউ ভ্যানে করে ঘরের মালামাল নিয়ে যাচ্ছেন। যাদের ঘর ইতোমধ্যেই নদীতে বিলীন হয়েছে, তারা খোলা আকাশের নিচে কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। চোখে-মুখে শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
ক্ষতিগ্রস্ত হাফিজা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এক রাতের মধ্যে আমাদের বসতভিটা নদীতে চলে গেছে। চোখের সামনে ঘরটা ভেঙে নদীতে মিশে গেল, কিছুই করতে পারিনি। এখন ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কোথায় থাকব, কীভাবে বাঁচব, সেটাই বুঝতে পারছি না। সরকারের কাছে দ্রুত সাহায্য চাই।’
কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমার প্রায় পাঁচ বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। ওই জমির ফসলেই সারা বছরের সংসার চলত। এখন জমিও নেই, আয়ের পথও নেই। আমরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। দ্রুত ভাঙন ঠেকানো না গেলে আরও অনেক কৃষকের একই পরিণতি হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত আলী জানান, নিজেদের উদ্যোগে ও স্বেচ্ছাশ্রমে এলাকাবাসী একটি অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সেটি ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত ভাঙন শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘বাঁধে ফাটল দেখা দেওয়ার পর বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো এত বড় ক্ষতি হতো না। এখন দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা না হলে পুরো গ্রামটাই নদীতে চলে যেতে পারে।’
আরেক বাসিন্দা আউয়াল মিয়া বলেন, ‘নদীভাঙন এখনও থামেনি। প্রতিদিন নদী আরও কাছে চলে আসছে। এখনই স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠানোরও দাবি জানান।
নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী বলেন, গত কয়েক দিনের ভাঙনে ১১টি পরিবারের বসতভিটা এবং প্রায় ৫০ একর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙন ঠেকাতে চার হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আর কতদিন? নদীশাসনের স্থায়ী উদ্যোগ না হলে তিস্তা শুধু জমি-ঘরবাড়িই নয়, মানুষের স্বপ্ন, জীবিকা আর প্রজন্মের স্মৃতিও গিলে খেতে থাকবে।