নারী নির্যাতন

আইনি সমাধানের আগে দরকার মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন

২৯ এপ্রিল। বেলা সাড়ে ১১টা। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪। আদালত কক্ষের ভেতরে স্থান নেই, তাই বারান্দায় পেতে রাখা বেঞ্চে বসে ছিলেন খুকি (ছদ্ম নাম) ও তার স্বজনেরা। মামলার নম্বর আর নাম ধরে ডাক পড়তেই তারা উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারকের সামনে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি জানালেন, প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের মামলায় এসেছেন। মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। কথা বলার এক পর্যায়ে মুখ ঢেকে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন তিনি। একইভাবে ঢাকার চারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঘোরার সময় অচেনা মুখগুলোতে বিষাদ ও উৎকণ্ঠার ছাপগুলো খুব স্পষ্টই অনুভব করা যাচ্ছিল।

প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে এ রকম অনেক ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার খবর উঠে আসছে। তবে শুধু ঘটনা বৃদ্ধিই নয়, বিচার পেতে দেরি আর আইন কার্যকরের দুর্বলতা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। দেশে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

পরিষদের তথ্যমতে, নির্যাতনের শিকার হওয়াদের মধ্যে ১ হাজার ২৩৪ জন কন্যা ও ১ হাজার ৫৭৪ জন নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে। গত বছরে দেশে মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী। ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মধ্যে ১০৪ জন কন্যা ও ৭৫ জন নারীসহ ১৭৯ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ১৮ জন কন্যা ও ১৩ জন নারীসহ ৩১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং পাঁচজন কন্যা ও দুই নারীসহ সাতজন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে ১৪৭ জন কন্যা ও ৪১ জন নারীসহ ১৮৮ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১৬৯ জন, যার মধ্যে ১১২ জন কন্যা। উত্ত্যক্তের শিকার হয়েছেন ৫৫ জন। এ কারণে একজন কন্যা ও তিনজন নারীসহ চারজন আত্মহত্যা করেছেন। সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন ছয় কন্যাসহ ১৯ জন।

woman

এ ছাড়া একই বছর বিভিন্ন কারণে ৭৩৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০৭ জন কন্যা ও ৬৩২ জন নারী। চার কন্যাসহ ২১ জন হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন। ৬০ কন্যাসহ ২৩০ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং ১৯৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। অন্যান্য নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে–এসিডদগ্ধ ৯ জন, অগ্নিদগ্ধ ৩৪ জন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন ৫২ জন, পারিবারিক সহিংসতায় শারীরিক নির্যাতন ৩৭ জন, গৃহকর্মী নির্যাতন ১৭ জন, অপহরণের শিকার ৭১ জন এবং অপহরণচেষ্টা ৩৪ জনকে। 

এদিকে, ২৪ জন কন্যাসহ ৫৫ জন পাচারের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৩৮ জন, ফতোয়ার শিকার একজন, বাল্যবিয়ের ঘটনা ৮টি ও বাল্যবিয়ের চেষ্টা ১৭টি এবং জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হয়েছেন দুজন। পাশাপাশি ৮৯ জন অন্যান্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

থানায় প্রথম বাধা

নির্যাতনের শিকার নারী যখন প্রথম থানায় যান, সেখান থেকেই ফেরেন ক্ষোভ নিয়ে। কখনও বলা হয়, 'এটা তো পারিবারিক ব্যাপার', আবার কখনও অভিযোগ নিতেই দেরি করেন পুলিশ।

অনেক সময় ভুক্তভোগীকে উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়—'আপনি কী করে ওই ব্যক্তির সঙ্গে গেলেন?', 'এত রাতে বাইরে কেন?', 'কাপড়-চোপড় দেখে কী বুঝায়?'—এ ধরনের প্রশ্ন নারীকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। অনেকে হেনস্তার ভয়ে অভিযোগ করতেই যান না। 

মামলা ও বিচার কেমন হচ্ছে?

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় ৯টি অভিযোগে মামলা করা যায়। সেগুলো হলো ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারণে মৃত্যু, বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, যৌন নিপীড়ন, যৌতুক, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দহনকারী পদার্থ দিয়ে সংঘটিত অপরাধ।

২০২৫ সালে হওয়া মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫ হাজার ১৭১ জন ও শিশু ১ হাজার ৮৯৭টি। ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর নারী নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলা ছিল ৫ হাজার ৫৬৬টি। তার আগে ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬টি ও ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা হয়েছিল নারী নির্যাতনের অভিযোগে।

woman-1

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি। ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৩ হাজার ৯১টি মামলা।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলেই মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটে, তখন সেটা নিয়ে হইচই হয়। কিন্তু যিনি ঘটনার শিকার হয়েছেন, তার পাশে থাকা বা মামলার বিচার ও তদন্ত ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে কি না, তা অনুসরণ করা হয় না। আবার অনেক ঘটনায় ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ভুক্তভোগী নারীকে দোষারোপ করা হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে ধর্ষণের ৪৪ শতাংশ অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানায়। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের অভিযোগে থানা ও আদালতে এসব মামলা করা হয়েছিল। পিবিআই এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমাণিত না হওয়া মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য। সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে, বাদীর অনীহা আর তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় তদন্তে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নেই

অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কিছু আইন আছে- 

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩): ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, নারী ও শিশু হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০: যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া উভয়ই অপরাধ, যার শাস্তি ১ থেকে ৫ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।

অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২: অ্যাসিড নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২: সাইবার ক্রাইম ও যৌন হয়রানির বিধান রয়েছে।

কিন্তু আইন থাকলেও কাজ হচ্ছে না। অভিযোগ নেওয়া থেকে শুরু করে তদন্ত, সাক্ষী উপস্থিত করা, রায় দেওয়া—প্রতি ধাপেই দুর্বলতা।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ঘটনা হলে কিছুদিন হইচই হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীর পাশে থাকা বা মামলা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা দেখা হয় না। তিনি বলেন, তদন্তের দিকেও নজর দিতে হবে। বেঁধে দেওয়া সময়ে তদন্ত শেষ করা হচ্ছে কি না, তা দেখা জরুরি। পুলিশ ও চিকিৎসকের মতো পেশাদার সাক্ষীরা অনেক সময় আদালতে আসেন না। তাদের আসা-যাওয়ার খরচও দেয় না কেউ। আর সাক্ষী সুরক্ষা ব্যাপারটিও ভেবেই না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শাহজাহান খান বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না। সঠিক বাস্তবায়ন আর জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এত ধীর বিচার প্রক্রিয়ায় অপরাধীরা প্রায়ই শাস্তি এড়িয়ে যায়।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেন, নারীর ওপর সহিংসতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পুরুষের ধারণা, নারীর ওপর সহিংসতা করার অধিকার তাদের আছে এবং তারা পার পেয়ে যাবে।

cover

কী করতে হবে

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি ব্যবস্থার পরামর্শ দিচ্ছেন:

প্রথমত, পুলিশকে সংবেদনশীল করতে হবে। থানায় নারী নির্যাতনের অভিযোগ গ্রহণের জন্য বিশেষ কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষণ জরুরি।

দ্বিতীয়ত, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অনলাইনে অভিযোগ ও প্রমাণ জমা দেওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগীর মানসিক কাউন্সেলিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।

চতুর্থত, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। স্কুল থেকে গণমাধ্যমে—সব জায়গায় নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের শিক্ষা দিতে হবে। 'নির্যাতনের জন্য নারী নিজেই দায়ী'—এমন কুসংস্কার দূর করতে হবে।

পঞ্চমত, কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেলে অপরাধীরা ভয় পায়।

শিরীন পারভীন হক বলছেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এর মূল বার্তা হবে—নারীকে মানুষ হিসেবে চিনুন, জানুন, সম্মান করুন। সরকারকে জরুরি অবস্থার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভুক্তভোগীরা যেভাবে সাহায্য পাবেন

যদি কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে এই নম্বরগুলো হাতের কাছে রাখুন:
১. জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯ (পুলিশ সরাসরি ব্যবস্থা নেবে)
২. নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হেল্পলাইন: ১০৯ (আইনি ও চিকিৎসা সহায়তা)

শুধু কঠোর আইন দিয়ে কোনো সমাজ সম্পূর্ণ নিরাপদ হয় না। প্রয়োগ আর সামাজিক সচেতনতা—এই দুই মেরুতে বদল ঘটাতে হবে। প্রতিটি নারী যাতে নির্ভয়ে রাস্তায় নামতে পারেন, স্বপ্ন দেখতে পারেন—সেই পরিবেশ তৈরি করা আজ সময়ের দাবি। এই প্রয়াসে সবার ভূমিকা থাকতে হবে। না হলে 'নিরাপত্তা' শব্দটি থাকবে কেবল কলমের কালিতেই।