আধুনিক সভ্যতার অনেক আগেই ভারতীয় উপমহাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছিল জ্ঞান ও বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা। সেই আলোকবর্তিকার নাম ‘তক্ষশীলা’। বর্তমান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত এই প্রাচীন নগরীটি ছিল বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন যুগের শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র।
নামকরণ ও পৌরাণিক পটভূমি
হিন্দু পুরাণমতে, অযোধ্যার রাজা দশরথের নাতি এবং ভরতের পুত্র ‘তক্ষ’-এর নামানুসারে এই নগরীর নামকরণ হয় ‘তক্ষশীলা’। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি প্রাচীন গান্ধার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনেকে মনে করেন, এখানে ‘তক্ষ’ নামক এক জাতির বসবাসের কারণে এলাকাটি ‘তক্ষখণ্ড’ এবং কালক্রমে ‘তক্ষশীলা’ নামে পরিচিতি পায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা ব্যবস্থা
তক্ষশীলা ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রগুলোর একটি। এর বিশেষত্ব ছিল:
ভর্তির নিয়ম: সাধারণত ১৬ বছর বয়সে ছাত্ররা এখানে ভর্তি হতো।
বিচিত্র পাঠ্যক্রম: বেদ, দর্শন, ব্যাকরণ ও সমরবিদ্যার পাশাপাশি এখানে চিকিৎসাশাস্ত্র (আয়ুর্বেদ), ধনুর্বিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, হিসাব বিজ্ঞান, অর্থনীতি, এমনকি হস্তশিল্প ও সঙ্গীতও শেখানো হতো।
বিনামূল্যে শিক্ষা: মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্ররা গুরুগৃহে কাজ করে পড়ার সুযোগ পেত। প্রায় ১০ হাজার ছাত্র-শিক্ষকের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই চত্বর।
তক্ষশীলার নক্ষত্ররা
তক্ষশীলার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার মূলে ছিলেন এখানকার দিকপাল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
- চাণক্য (কৌটিল্য): রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির কিংবদন্তি চাণক্য ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যক্ষ। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘অর্থশাস্ত্র’ আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় তাঁর কৌশল ছিল অনন্য।
- পাণিনি: সংস্কৃত ভাষার জনক ও ব্যাকরণবিদ পাণিনি এখানেই অধ্যাপনা করতেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অষ্টাধ্যয়ী’ আজও ভাষাবিজ্ঞানের এক বিস্ময়। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কিও পাণিনির ঋন স্বীকার করেছেন।
- জীবক: গৌতম বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং রাজা বিম্বিসারের রাজবৈদ্য জীবক এখান থেকেই শিক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার বা শল্যচিকিৎসায় অবিশ্বাস্য দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।
- চরক ও আত্রেয়: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পথিকৃৎ আত্রেয় এবং কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের চিকিৎসক চরক তক্ষশীলার চিকিৎসা গবেষণাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
বিদেশি আক্রমণ ও উত্থান-পতন
তক্ষশীলার ভৌগোলিক অবস্থান একে বারবার বিদেশি আক্রমণের মুখে ফেলেছে:
পারস্য ও গ্রিক আক্রমণ: খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্য সম্রাট কাইরাস ও দারায়ুস এটি দখল করেন। পরবর্তীতে ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহাবীর আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশীলায় প্রবেশ করেন এবং রাজা অম্ভির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।
মৌর্য যুগ ও বৌদ্ধ বিপ্লব: সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও চাণক্যের হাত ধরে এখানে মৌর্য শাসনের গোড়াপত্তন হয়। সম্রাট অশোকের সময় তক্ষশীলা বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
গৌরবের অবসান ও কফিনের শেষ পেরেক
তক্ষশীলার পতনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। গ্রিক, শক, কুষাণ ও পারস্যদের মুহুর্মুহু আক্রমণে এই নগরী ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে। তবে ইতিহাসের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় মধ্য এশিয়া থেকে আসা শ্বেত হুন (White Huns) জাতি। ৪৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে হুনদের ভয়াবহ আক্রমণে তক্ষশীলার রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। তারা শিবের উপাসক হওয়ায় বৌদ্ধ মঠগুলো রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। ফলে এককালের মুখরিত এই শিক্ষাকেন্দ্রটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়।
তক্ষশীলা কেবল একটি বিলুপ্ত নগরী নয়, এটি আমাদের উপমহাদেশের শিক্ষা ও উৎকর্ষের এক কালজয়ী স্মারক। ধ্বংসের হাজার বছর পরও তক্ষশীলার সেই সোনালী দিনগুলো আজও বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।