এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করার পর শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কথা। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই স্বাভাবিক ধারাতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন। এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছেন ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী এখন পর্যন্ত একাদশ শ্রেণির ভর্তি প্রক্রিয়ায় আবেদন করেননি।
তবে এই সংখ্যাকে সরাসরি ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থী’ বলা যাচ্ছে না। তাদের কেউ কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা বা অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যেতে পারেন, কেউ বিদেশে বা কর্মক্ষেত্রে যেতে পারেন, আবার কেউ হয়তো পরবর্তী ধাপে ভর্তি হবেন। শিক্ষা প্রশাসনের কাছেও এই ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জনের সুনির্দিষ্ট গতিপথের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো নেই। কিন্তু সংখ্যাটি যে একটি বড় সতর্কবার্তা, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে এসএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত যে শিক্ষার্থী কোনোভাবে টিকে থাকে, তার সামনে এসএসসির পর সাধারণত দুটি বড় পথ—একাদশ-দ্বাদশে সাধারণ শিক্ষা অথবা কারিগরি, মাদ্রাসা ও অন্যান্য বিকল্প শিক্ষা।
সমস্যা হচ্ছে, এসএসসি পাস করার পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে পরবর্তী স্তরে ধরে রাখার জন্য শুধু আসন তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সহজে প্রবেশের সুযোগ, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা, কাছাকাছি মানসম্মত প্রতিষ্ঠান, পরিবহন, শিক্ষার ভবিষ্যৎ মূল্য এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক। এ বছর সেই জায়গাগুলোতেই একাধিক সমস্যা একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রথম কারণ: অর্থনৈতিক চাপ
একজন শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হওয়া মানেই শুধু ভর্তি ফি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বই, পোশাক, যাতায়াত, কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষাসহ নানা খরচ।
শহরের পরিবারের জন্য যে ব্যয় সামলানো সম্ভব, গ্রামীণ বা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য সেটি অনেক সময় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য কম হলে এসএসসি পাস করা একজন কিশোর-কিশোরীকে দ্রুত কর্মজীবনে পাঠানোর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও উচ্চমাধ্যমিকে এসে শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অতীতের বিভিন্ন জরিপেও অর্থনৈতিক কারণ, কর্মে প্রবেশ ও পারিবারিক পরিস্থিতিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের এই ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জনের মধ্যে ঠিক কতজন অর্থনৈতিক কারণে পড়াশোনা থেকে সরে যাচ্ছে, সে বিষয়ে বর্তমান পর্যায়ে নির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই।
দ্বিতীয় কারণ: ‘ভালো কলেজে’ যাওয়ার প্রবণতা
এবারের ভর্তি প্রক্রিয়ায় আরেকটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়েছে। একদিকে বহু কলেজ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না, অন্যদিকে পরিচিত ও বড় কলেজগুলোতে আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি আবেদন পড়েছে।
প্রথম ধাপে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। আবেদন করেও আসন পাননি ১৪ হাজার ৪১৫ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া ২ হাজার ২০৫ জন শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
অর্থাৎ সমস্যা কেবল ‘আসন নেই’—এমন নয়। বরং দেশের কোথাও আসন নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা, আবার কোথাও শিক্ষার্থীই নেই। এই বৈষম্য শিক্ষার্থীদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাকে আরও বাড়াতে পারে।
তৃতীয় কারণ: গ্রামীণ কলেজের আকর্ষণ কমে যাওয়া
ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের পরিচিত কলেজে ভর্তি হলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরি কিংবা সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন ধারণা অনেক পরিবারে রয়েছে। ফলে গ্রামের শিক্ষার্থীও এসএসসি পাস করার পর স্থানীয় কলেজের বদলে জেলা শহর বা বড় শহরের কলেজ বেছে নিতে চায়। এর ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
একদিকে নামি কলেজে হাজার হাজার আবেদন; অন্যদিকে বহু উপজেলা বা মফস্সলের কলেজে পর্যাপ্ত আবেদনই নেই।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এবার ১১টি কলেজে কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেনি। আরও ৪১৬টি কলেজে আবেদন পড়লেও কোনো শিক্ষার্থী ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে বরাদ্দ পায়নি। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক বৈষম্যেরও একটি চিত্র।
চতুর্থ কারণ: শিক্ষার্থী কমছে, আসন বাড়ছে
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো—শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় আসন অনেক বেশি। দেশের কলেজ ও সমমানের প্রতিষ্ঠানে একাদশ শ্রেণির জন্য প্রায় ২৫ লাখ আসন রয়েছে। অথচ এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। গত বছরও মোট আসনের ৪১.৩ শতাংশ খালি ছিল বলে শিক্ষা বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল। যদি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে থাকে কিন্তু একই হারে কলেজ ও আসন থেকে যায়, তাহলে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রমেই শিক্ষার্থী সংকটে পড়বে।
পঞ্চম কারণ: জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রভাব
এসএসসি পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার একটি কারণ দেশের জনমিতিক পরিবর্তনও হতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে স্থানীয় কলেজে। কারণ অধিকাংশ উপজেলা বা গ্রামীণ কলেজ আশপাশের কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে।
ফলে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষার্থী কমে গেলে কলেজের সম্ভাব্য ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যায়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হলে কিছু কলেজে পূর্ণাঙ্গ শ্রেণি চালানো, শিক্ষক-কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
ষষ্ঠ কারণ: শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক দুর্বল
এসএসসি পাস করার পর একজন শিক্ষার্থীর সামনে একটি বাস্তব প্রশ্ন থাকে—আরও দুই বছর পড়াশোনা করে এইচএসসি করার পর কী হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে আবার প্রতিযোগিতা, তারপর কয়েক বছর উচ্চশিক্ষা। অন্যদিকে স্বল্প আয়ের পরিবারে দ্রুত উপার্জনে যাওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে।
যদি একজন শিক্ষার্থী মনে করে কলেজে আরও দুই বছর পড়েও তার কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু এখনই কোনো কাজ শিখে আয় করা সম্ভব, তাহলে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই এসএসসি-পরবর্তী শিক্ষানীতি শুধু ‘কতজন কলেজে ভর্তি হলো’ দিয়ে মূল্যায়ন করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। দেখতে হবে—কে কোন ধারায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কতজন শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করছে।
সপ্তম কারণ: ভর্তি ব্যবস্থার পছন্দ-নির্ভর বৈষম্য
বর্তমান একাদশ ভর্তি ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম পাঁচটি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজ পছন্দক্রমে দিতে হয়। ভর্তি পরীক্ষা নেই; এসএসসি বা সমমানের ফল এবং পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়।
এই ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী যদি কেবল কয়েকটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক কলেজ বেছে নেয়, তাহলে জিপিএ-৫ থাকলেও প্রথম ধাপে কোনো কলেজ নাও পেতে পারে।
এবারের ২ হাজার ২০৫ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটেছে বলে শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ একদিকে অনেক কলেজ শিক্ষার্থী পাচ্ছে না, অন্যদিকে কিছু শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজ না পাওয়ায় প্রথম ধাপে কোনো আসন পাচ্ছে না।
এখানে ব্যবস্থাটির একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট—দেশে আসন প্রচুর, কিন্তু শিক্ষার্থীর পছন্দ ও প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান।
অষ্টম কারণ: মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে আস্থার সংকট
গ্রামীণ কলেজের শিক্ষার্থী সংকটকে শুধু ‘শহরমুখী প্রবণতা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। অভিভাবকেরা সাধারণত যে প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার মান, শিক্ষক উপস্থিতি, ফলাফল, অবকাঠামো, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির দিক থেকে ভালো মনে করেন, সেখানেই সন্তানকে পাঠাতে চান।
ফলে কোনো স্থানীয় কলেজ দীর্ঘদিন ধরে ভালো ফলাফল বা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে সেটি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী হারাতে পারে। অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলাফল ও সুনাম তৈরি হলে সেখানে আশপাশের অনেক জেলা থেকেও শিক্ষার্থী যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা—১ লাখ ৪৮ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য কোথায়? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী একাদশের আবেদন করেননি। কিন্তু তাদের কী হয়েছে?
একদিকে প্রায় ২৫ লাখ আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী অর্ধেকেরও কম; অন্যদিকে নামি কলেজে আসনের তুলনায় বহুগুণ আবেদন। কোথাও শিক্ষার্থী ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লড়তে হচ্ছে, কোথাও একটি আসনের জন্য বহু শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতা করছে।
এই বৈপরীত্য দেখিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এখন শুধু ‘আরও বেশি শিক্ষার্থীকে কলেজে ভর্তি করানোর’ সমস্যার মধ্যে নেই; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—কোন শিক্ষার্থী কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কোন শিক্ষাপথ তার জন্য কার্যকর এবং কে পথের মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে।
১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থীর পরবর্তী গতিপথের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই অদৃশ্য সংকটের প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।