যুদ্ধে আমেরিকাকে হারানো নয়, থামিয়ে দেয়াই ইরানের কৌশল?

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৮ এএম

যুদ্ধের প্রচলিত হিসাব বলছে, সামরিক শক্তির বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটি, উন্নত বিমান ও নৌবহর, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট এবং দীর্ঘ-পাল্লার নির্ভুল অস্ত্র। ইরানের পক্ষে প্রচলিত অর্থে এই শক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন।

কিন্তু ইরানের যুদ্ধকৌশলকে শুধু ‘কে বেশি শক্তিশালী’—এই প্রশ্ন দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, তেহরানের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচলিত যুদ্ধে পরাজিত করা নয়; বরং যুদ্ধকে এমন দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যাতে ওয়াশিংটনের জন্য সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক খরচ ক্রমে বাড়তে থাকে।

শক্তির অসম লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে ইরানের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। মার্কিন বাহিনী আকাশ ও সমুদ্রপথে দূর থেকে হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। বিপরীতে ইরানের সামরিক শক্তির বড় অংশ নির্ভর করে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা এবং অসম যুদ্ধকৌশলের ওপর।

তাই ইরানের জন্য যুদ্ধের লক্ষ্য যদি হয় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ধ্বংস করা কিংবা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ অচল করে দেওয়া, সেটি অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু লক্ষ্য যদি হয় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির খরচ বাড়ানো, ঘাঁটি ও জাহাজকে প্রতিনিয়ত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় রাখা এবং ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা—তাহলে হিসাবটি ভিন্ন।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার ও ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন আঞ্চলিক সম্পদ ও নৌবাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা ও সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।

‘জয়’ নয়, প্রতিপক্ষের ধৈর্য পরীক্ষা

এই কৌশলের মূল শব্দ হতে পারে—সময়। একটি দ্রুত যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বড় সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, ততই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে যায় জ্বালানি মূল্য, সামরিক ব্যয়, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যবহার, মিত্রদের নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ।

রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে—বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মাধ্যমে। এখানেই ‘outlast’ বা প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকার ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর অর্থ এই নয় যে ইরান সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করবে। বরং তেহরানের হিসাব হতে পারে—যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জন না করেই দীর্ঘ সময় সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যয় করতে হয়, তাহলে যুদ্ধের ফলাফল সামরিক বিজয়ের বদলে আলোচনার টেবিলে নির্ধারিত হতে পারে।

হরমুজ কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির ওপর ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে এমন একটি চাপ তৈরির সুযোগ দেয়, যা কেবল সামরিক শক্তির হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলবাজারে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে এবং বাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে এখানেও ইরানের কৌশলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের প্রবাহ পুনরুদ্ধারে অগ্রগতি করেছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে মার্কিন চাপও বাড়ছে। অর্থাৎ হরমুজ ইরানের জন্য চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও এটি এমন কোনো একমুখী অস্ত্র নয়, যার ব্যবহার শুধু প্রতিপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্রেরও রয়েছে ‘সময়’-এর হিসাব

ইরানের কৌশল বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাও দেখতে হবে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতকে কেন্দ্র করে মার্কিন সামরিক ব্যয়, অস্ত্রের ব্যবহার এবং আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মার্কিন বাহিনীর ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

তবে এটিকে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন সক্ষমতা, বৈশ্বিক মিত্র নেটওয়ার্ক এবং সামরিক সরবরাহব্যবস্থা ইরানের তুলনায় অনেক বড়। বরং বিষয়টি হলো—একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যে ব্যয় হয় এবং আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যে ব্যয় হয়, তার মধ্যে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। এই অসম ব্যয় দীর্ঘ সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইরানের দুর্বলতাও কম নয়

তবে ‘ইরান শুধু টিকে থাকলেই জিতে যাবে’—এমন সরল হিসাবও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ইরানের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং তেল রপ্তানির ওপর চাপের মুখে রয়েছে। ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের নগদ অর্থপ্রবাহের সংকট তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতাকে সীমিত করছে।

রয়টার্সও জানিয়েছে, হরমুজকে কেন্দ্র করে ইরানের লিভারেজের কার্যকারিতা কমানোর চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন এবং মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ তেহরানের ওপর বাড়ছে। অর্থাৎ সময় ইরানের পক্ষে যেমন একটি কৌশলগত সম্পদ, তেমনি সেটি তার জন্য ঝুঁকিও।

প্রক্সি ও আঞ্চলিক চাপ

ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো আঞ্চলিক চাপ। ইয়েমেনের হুথিদের হামলা, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে সংঘাতকে একটি মাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবে এখানেও ইরানের জন্য ঝুঁকি আছে। অতিরিক্ত আঞ্চলিক হামলা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করতে পারে। ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্টের বিশ্লেষণেও এই দ্বৈত ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।

যুদ্ধ কি ‘স্টেলমেট’-এর দিকে যাচ্ছে?

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতকে ‘স্টেলমেট’ বা অচলাবস্থার দিকে যাওয়া সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত স্পষ্ট সামরিক বা কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পারেনি এবং হরমুজ ও ইরানি বন্দরের ওপর পারস্পরিক চাপ পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করছে।

অন্যদিকে আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণও বলছে, ছয় মাসের সংঘাতের পর যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তির পথ এখনো অনিশ্চিত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দীর্ঘ যুদ্ধ নিজেই কোনো পক্ষের বিজয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের ব্যয় বাড়ে এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত হিসাবটা কোথায়?

ইরানের জন্য ‘outlast’ কৌশল সফল হওয়ার অর্থ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে হারানো নয়, বরং এমন একটি অবস্থান তৈরি করা যেখানে ওয়াশিংটনও যুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত ফল এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচের মধ্যে নতুন করে হিসাব করতে বাধ্য হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা।

ইরানের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—অর্থনৈতিক ক্ষয়, সামরিক সক্ষমতার অবনতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ সহ্য করে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা। তাই বর্তমান সংঘাতকে শুধু ‘কে কাকে হারাবে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করলে বাস্তব কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। আসল প্রশ্ন হতে পারে—কে কতদিন নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য ধরে রাখতে পারবে, কতটা ব্যয় সহ্য করতে পারবে এবং শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কতটা দর-কষাকষির ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে।

এই অর্থে ইরানের কৌশল সামরিক বিজয়ের চেয়ে সহনশীলতা, সময় এবং প্রতিপক্ষের যুদ্ধ-ইচ্ছার ওপর চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখা যায়। তবে বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, এই কৌশলের শেষ ফলাফল এখনো নির্ধারিত নয়।

এমইউ
আরও পড়ুন