শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে: ভিসি আমানুল্লাহ

দেশে শিশু অধিকার সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধ এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। 

 

তিনি বলেছেন, দেশে ৪৭ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় এ হার ৫৮ শতাংশের বেশি। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৩৫ লাখে দাঁড়িয়েছে।

 

বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির মিলনায়তনে ‘শিশুর স্বপ্নে ৫০ বছর: অর্জন, অভিজ্ঞতা ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিশু অধিকার দিবস ২০২৬ ও বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ সেমিনারের আয়োজন করে।

 

ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘ডেটা বলছে, এ দেশের শিশুরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।’ শিশুদের সুরক্ষায় দৃশ্যমান উন্নয়নের পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিস্থিতির উন্নয়নে সমন্বিত ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিতে হবে। এসব সমস্যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

 

শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, ‘অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার এখনো উদ্বেগজনক। দেশের ২৪ শতাংশ শিশু ভয়াবহ অপুষ্টির শিকার। বস্তি ও উপকূলীয় এলাকায় এ হার ৩৬ থেকে ৪৫ শতাংশ। প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু সিসাদূষণে আক্রান্ত; কোনো কোনো শহরাঞ্চলে এ হার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।’

 

শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জাতীয়ভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৮০ শতাংশ হলেও শহুরে বস্তিতে তা ৭৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং উপকূলীয় এলাকায় ৭৮ থেকে ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার প্রায় ৩৪ শতাংশ। বস্তি ও উপকূলীয় অঞ্চলে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্নের হারও ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে।’

 

শিশুশ্রম নিয়ে ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী কর্মরত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৩৫ লাখ হয়েছে। শিশুশ্রমের হার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে। শহুরে বস্তিতে কর্মরত শিশুদের ৬০ শতাংশের বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত।’

 

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ‘চাইল্ড ম্যারিজ চ্যাম্পিয়ন’ তৈরি করার আহ্বান জানান তিনি। যারা বাল্যবিবাহ ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের কাজকে সমাজে মডেল হিসেবে তুলে ধরতে হবে। কারণ দেশে বাল্যবিবাহ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

 

শিশুদের ওপর সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘৮৬ শতাংশ শিশু বাড়ি অথবা বিদ্যালয়ে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। শিশুদের জন্য শুধু নীতি ও প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; এসব উদ্যোগ সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।’

 

তিনি বলেন, ‘একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য শুধু খাবার, পোশাক ও নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়। তার প্রয়োজন ভালোবাসা, যত্ন, সঠিক শিক্ষা, সুস্থ বিনোদন এবং নিজের কথা বলার সুযোগ। শিশুর অধিকারকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সাথে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সমানভাবে জড়িত।’

 

দেশব্যাপী শিশু অধিকার আন্দোলনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল নেটওয়ার্ক কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিয়ে ড. আমানুল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২ হাজার ৫০০ অধিভুক্ত কলেজে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে। এ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে শিশু অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম বন্ধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।’ 

 

এ কাজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট সদস্যদের বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির সাথে যুক্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।

 

সেমিনারে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপির সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এমপি। 

 

বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সেলিমা রহমান।

 

প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ। 

 

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান তথ্য অফিসার সৈয়দ আবদাল আহমদ। 

 

স্বাগত বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রওশন আরা বেগম। 

 

আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অধ্যাপক ড. কামাল আহমেদ চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ শিশু অ্যাকাডেমির মহাপরিচালক মোছা: আরজু আরা বেগম।