শিক্ষা খাতে অর্থায়ন কমানো, শিক্ষক সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্সে শুরু হওয়া আন্দোলন ইতোমধ্যে বেলজিয়ামসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে প্রভাব ফেলেছে। কোথাও স্কুল-কলেজ অবরোধ ও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের উপকণ্ঠে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ থেকে আন্দোলনের সূচনা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত চাপ, শিক্ষক ও কর্মীর ঘাটতি, পুরোনো ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থায় নানা সমস্যা তাদের শিক্ষাজীবনকে কঠিন করে তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
৬ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে ২ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেয় বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে। প্যারিসেই অংশ নেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। বিভিন্ন স্থানে স্কুল অবরোধ, ক্লাস বর্জন এবং মিছিল হয়।
আন্দোলনটি শুধু উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন ও কিছু অভিভাবকও এতে যুক্ত হয়েছেন। অক্টোবরে এক পর্যায়ে ফ্রান্সের প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশপথ অবরোধের খবর পাওয়া যায়।
ফরাসি শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, স্কুল ভবন ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন।
অভিভাবকরাও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দেশটির একটি বড় অভিভাবক সংগঠন বলেছে, তাদের সন্তানদের আরও ভালো পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশও দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার সমস্যার কথা তুলে ধরেছে।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশাপাশি কিছু এলাকায় পরিস্থিতি সহিংস হয়ে উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, স্কুল ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং রাস্তা অবরোধের ঘটনা ঘটেছে।
ফ্রান্সে আন্দোলন শুরুর পর ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; তাদের বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যদেরও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে লঁস শহরের একটি ঘটনা। সেখানে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাত গুরুতরভাবে আহত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনার পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের স্টান গ্রেনেড ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
ফ্রান্সের পর প্রতিবেশী বেলজিয়ামেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে ফরাসিভাষী অঞ্চলে শিক্ষা সংস্কার, বাজেট কমানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বৃদ্ধি এবং শ্রেণিকক্ষের চাপ নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে।
লিège শহরে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভের এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় এবং শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বেলজিয়ামের শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের শিক্ষা সংস্কারের কিছু সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। এর মধ্যে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ইউরোর বাজেট কমানোর পরিকল্পনা এবং উচ্চশিক্ষার ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি রয়েছে।
শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানো ও শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যাকে কেন্দ্র করে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গ্রিস, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ ও সংগঠিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট থেকে প্রায় ১০০ কোটি ইউরো কমানোর সম্ভাবনা নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ফলে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পর অন্য দেশগুলোতেও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতে পারে।
তবে পুরো ইউরোপে একই সংগঠনের নেতৃত্বে একটি অভিন্ন আন্দোলন চলছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দেশের শিক্ষা সংকট ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও তাদের দাবির মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন সরকার বর্তমানে বাজেট ঘাটতি কমানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপে রয়েছে। একই সময়ে ঋণের ব্যয় বাড়ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সরকারি খাতে ব্যয় সংকোচনের আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, এই সংকোচনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার মান ও সুযোগের ওপর।
ফ্রান্সের ঘটনাটি তাই শুধু শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, সরকারি ব্যয়, সামাজিক বৈষম্য এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু মিলেই আন্দোলনের পরিধি বড় হচ্ছে।
ফরাসি সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে এবং শিক্ষা অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট ও স্কুল পরিচালনার বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বলছে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে চায়।
ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রভাব ইতোমধ্যে বেলজিয়ামে দৃশ্যমান। ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও শিক্ষা খাতে বাজেট সংকোচন ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্নে অসন্তোষ তৈরি হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ইউরোপের তরুণদের কাছে শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক সেবা নয়—এটি তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, সামাজিক গতিশীলতা ও সুযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও ব্যয় সংকোচনের যেকোনো সিদ্ধান্ত নতুন করে শিক্ষার্থী আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে।