বলিউডের ত্রাস লরেন্স বিষ্ণোই, কে এই গ্যাংস্টার?

মুম্বাইয়ের জুহুতে অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলির ঘটনার পর ফের আলোচনায় এসেছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম। এ ঘটনায় টাইগার গুরুতর আহত না হলেও তার গাড়িচালকসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নামে প্রচারিত একটি বার্তায় ঘটনার দায় স্বীকারের পাশাপাশি সালমান খানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এতে বলিউডে বিষ্ণোই চক্রের প্রভাব ও তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘটনার তদন্তে সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজস্থানের কোটা থেকে এক কিশোরসহ তিন সন্দেহভাজনকে আটক করে পুলিশ। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রেহান নামের একজনের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের কথিত সহযোগী অনিল পণ্ডিতের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে হামলার দায় স্বীকার করে ছড়ানো বার্তাটির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। লরেন্স বিষ্ণোই নিজে এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন কি-না, সে বিষয়েও চূড়ান্ত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

১৯৯৩ সালে ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম লরেন্স বিষ্ণোইয়ের। শৈশব কাটে আবোহার এলাকায়। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার জন্য চণ্ডীগড়ে গিয়ে ডিএভি কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার পরিচিতির পরিধি বাড়ে। এ সময়ই গোল্ডি ব্রারের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে বিরোধের পর ধীরে ধীরে তার বিরুদ্ধে হামলা, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। একপর্যায়ে লরেন্সের নাম ভারতের সংগঠিত অপরাধজগতের আলোচিত ব্যক্তিদের তালিকায় উঠে আসে।

গ্রেপ্তার ও কারাবাসের পরও তার অপরাধচক্রের কার্যক্রম থেমে থাকেনি বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অভিযোগ। কারাগারের বাইরে থাকা কথিত সহযোগীদের মাধ্যমে চক্রের যোগাযোগ ও তৎপরতা চালানোর অভিযোগও রয়েছে। তবে লরেন্সের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সবই আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়। বর্তমানে তিনি গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিধিনিষেধের কারণে তাকে কারাগারের বাইরে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্য তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও নির্দিষ্ট অনুমতির প্রয়োজন হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে বলিউড অভিনেতা সালমান খানের বিরোধের পেছনে রয়েছে ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের মামলা। রাজস্থানে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ ছবির শুটিং চলাকালে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার অভিযোগ ওঠে সালমানের বিরুদ্ধে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। প্রাণীটির সুরক্ষা ও সংরক্ষণ তাদের ধর্মীয়-সামাজিক ঐতিহ্যেরও অংশ। ২০১৮ সালে ওই মামলায় সালমান খানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। একই বছর লরেন্স প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকি দেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়েও সালমানকে লক্ষ্য করে হুমকি দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের নাম উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টসের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালান। পরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের তদন্তে হামলাটির সঙ্গে বিষ্ণোই চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। লরেন্সের ভাই আনমোলের নামে প্রচারিত একটি বার্তায় ঘটনাটিকে ভবিষ্যতে আরও হামলার সতর্কবার্তা হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

বলিউড ও বিনোদনজগতে বিষ্ণোই চক্রের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডের পর। ২০২২ সালের ২৯ মে তাকে হত্যা করা হয়। পরে বিদেশে অবস্থানরত গোল্ডি ব্রার হত্যার দায় স্বীকার করেন। ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলোও এই ঘটনায় বিষ্ণোইয়ের কথিত সহযোগীদের অভিযুক্ত করে। এরপর ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে মহারাষ্ট্রের সাবেক মন্ত্রী বাবা সিদ্দিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। সালমান খানসহ বলিউডের একাধিক তারকার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর বিষ্ণোই চক্রের নামে প্রচারিত বার্তায় সালমানকে সহায়তা করা ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এর ফলে উদ্বেগ শুধু সালমান খানের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তার সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তি, বন্ধু ও পরিচিতজনদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।

বিষ্ণোই চক্রের নাম জড়িয়েছে ভারতের বাইরের কয়েকটি হামলার ঘটনাতেও। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কানাডার সারেতে কৌতুকশিল্পী কপিল শর্মার ক্যাফেতে একাধিকবার গুলি চালানো হয়। একটি হামলার পর দায় স্বীকারের বার্তায় সালমান খানের সঙ্গে কপিলের সম্পর্কের প্রসঙ্গও তোলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পরিচালক রোহিত শেঠির জুহুর বাড়িতে গুলির ঘটনার পরও বিষ্ণোইয়ের সহযোগী পরিচয়ে দায় স্বীকারের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে এসব বার্তার সত্যতা এবং প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে লরেন্সের সরাসরি নির্দেশের সম্পর্ক আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির সাম্প্রতিক ঘটনাটিও একই কারণে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তে হামলাকারীদের পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং কথিত অপরাধচক্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও লরেন্সের কথিত অপরাধচক্র কীভাবে সক্রিয় রয়েছে, তা নিয়ে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে কারাগারের বাইরে থাকা সহযোগী, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

সিএনএনের এক অনুসন্ধানে তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগের বরাতে বলা হয়েছে, চক্রের সদস্যদের মধ্যে তথ্য সীমিতভাবে ভাগ করা হয়। এতে কোনো একজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা। সাংবাদিক জুপিন্দরজিৎ সিং, যিনি ‘হু কিলড মুসেওয়ালা?’ বইটির লেখক, আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে এই ধরনের অপরাধী চক্রের পরিচিতি ও আতঙ্ক ছড়ানোর অর্থনৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এ ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শুধু হামলা নয়, হামলার পর দায় স্বীকারের প্রচারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ছাড়াও অন্যদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয় এবং চক্রটির প্রভাব সম্পর্কে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি হুমকি বা দায় স্বীকারের বার্তা সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না। বার্তার উৎস, প্রযুক্তিগত তথ্য, অভিযুক্তদের যোগাযোগ এবং তদন্তের প্রমাণ মিলিয়েই সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করতে হয়।

লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম ঘিরে আলোচনার পেছনে রয়েছে একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ড, তারকাদের লক্ষ্য করে দেওয়া হুমকি এবং বিভিন্ন হামলার ঘটনায় তার কথিত সহযোগীদের নাম উঠে আসা। বিশেষ করে সালমান খানের সঙ্গে বিরোধকে কেন্দ্র করে বলিউডের অন্য ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকির অভিযোগ এই চক্রকে বিনোদনজগতের নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

তবে কোনো অপরাধের দায় স্বীকার করে বার্তা প্রকাশ, কোনো গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এগুলোর কোনোটিই এককভাবে অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তের ফল, আদালতের নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সূত্র: সিএনএন, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আলজাজিরা।