নীল প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত বুকে নিঃশব্দে জেগে উঠছে এক রুদ্র প্রকৃতির মহাকাব্য। যে সমুদ্রের ঢেউয়ে একদিন পেরুর জেলেরা বড়দিনের রাতে পরম মায়া আর বিস্ময়ে নাম রেখেছিল ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’, সেই এল নিনোই এবার রূপ নিতে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রলয়ঙ্করী এক জলবায়ু খ্যাপামিতে।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা ‘নোয়া’ (NOAA) জানিয়েছে, মহাসাগরের চেনা বাতাসের চেনা ছন্দ হারিয়ে গেছে। আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য ইকোনোমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত ৭৫ বছরের সমস্ত রেকর্ড চূর্ণ করে এক নজিরবিহীন দহন ও প্লাবনের বার্তা নিয়ে ধেয়ে আসছে এবারের এল নিনো।
প্রকৃতির এই অলিখিত নিয়মে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস যখন তার পথ হারায়, তখন সমুদ্রের উপরিভাগের জলভাগ হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক তপ্ত। সাধারণত সমুদ্রের ওম দীর্ঘমেয়াদি গড়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেই তাকে শক্তিশালী এল নিনো বলা হয়। কিন্তু জলবায়ুর নিখুঁত গাণিতিক মডেলগুলো জানাচ্ছে এক ভয়ঙ্কর তথ্য; ২০২৬ সালের এই অবশিষ্ট দিনগুলোতে এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সমুদ্রের সেই চেনা জল স্তরের উষ্ণতা আড়াই ডিগ্রি ছাড়িয়ে ছুঁয়ে ফেলতে পারে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি! এর আগে ১৯৮২-৮৩ সালের সেই রূপালি জলদহনও ২.৫ ডিগ্রির ঘরে এসে থমকে গিয়েছিল। এবার যেন ভাঙনের সব সীমানা পেরোনোর পালা।
এল নিনো হয়তো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সন্তান নয়, কিন্তু মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সর্বগ্রাসী আগুনের সাথে যখন তার মিলন ঘটে, তখন পৃথিবীর বুকে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ইতিপূর্বে ১৯৯৮ আর ২০১৬ সালের বুকে এই আগুন ঢেলেছিল এল নিনো। আর আজ, ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর ২০২৪-এর বুক চিরে যে নতুন এল নিনোর জন্ম হলো, তা আগামী ২০২৭ সালকে পৃথিবীর ইতিহাসের এক চরমতম অগ্নিগর্ভ বছর হিসেবে রূপ দিতে পারে। প্রকৃতির এই খেয়ালে পৃথিবীর এক বুক যখন তৃষ্ণার্ত খরায় পুড়বে, অন্য বুক তখন ভাসবে চোখের জলের মতো আকস্মিক বন্যায়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং ইউরোপীয় কমিশন এক যৌথ উদ্বেগে জানিয়েছে, এই জলবায়ু-তাণ্ডবের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হবে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, সুদান, সোমালিয়া, চাদ থেকে শুরু করে হাইতি ও ভেনিজুয়েলার মতো ভাগ্যাহত দেশগুলোকে। সোমালিয়ার মাটি আগামী অক্টোবর পর্যন্ত একফোঁটা জলের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকবে, আর তারপর ডিসেম্বর জুড়ে নামবে এমন আকাশভাঙা বৃষ্টি, যা তৃষ্ণার্ত মাটির বুক ভেদ করে জন্ম দেবে সংহারী বন্যা। এর সাথে যোগ হয়েছে পৃথিবীর মানুষের তৈরি নিজস্ব ক্ষত- ইরানকে ঘিরে যুদ্ধংদেহী আবহ আর হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ জলপথ, যার কারণে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে চাষাবাদের মূল চাবিকাঠি সার সরবরাহ।
মহাবিশ্বের এই আদিম খেলাকে হয়তো মানুষ পুরোপুরি রুখতে পারবে না, কিন্তু খরাসহিষ্ণু স্বপ্নের বীজ বুনে আর আগাম সতর্কতার বর্ম পরে তার আঘাতকে কিছুটা ম্লান করা সম্ভব। প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কি পারবে তার শেষ সবুজটুকুকে আগলে রাখতে? সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।