হার্ট অ্যাটাকের আগাম ১২টি সংকেত জানুন

হৃদরোগের মতো মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি হওয়ার আগে শরীর প্রায়ই নানা সংকেত দিতে শুরু করে। চিকিৎসকদের মতে, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সপ্তাহখানেক আগেই বুকে অস্বস্তি, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের মতো প্রাথমিক লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে পারে। 

তাই এসব পূর্বলক্ষণ সময়মতো শনাক্ত করতে পারলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় এবং এড়ানো যেতে পারে যেকোনো মারাত্মক পরিণতি। হার্ট অ্যাটাকের আগে মানব শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে চলুন সেগুলো জেনে নেওয়া যাক। 

১. বুকে ব্যথা 

২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ২৪২ জনের মধ্যে ১০০ জনের ক্ষেত্রে বড় কোনো উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে কিছু পূর্বলক্ষণ বা মাইনর উপসর্গ ছিল। 

এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ৬৮ শতাংশই হার্ট অ্যাটাকের আগে বুকে ব্যথা অনুভব করেছিলেন, যা এটিকে সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করে। 

২. বুকে ভারী ভাব 

একই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক উপসর্গ রয়েছে এমন ৪৪ শতাংশ মানুষই বুকে ভারী ভাব, চাপ বা আঁটসাঁট ভাব অনুভব করেছেন, যা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রমের সাথে যুক্ত। এগুলো হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম পরিচিত লক্ষণ।

৩. বুক ধড়ফড় করা 

ওই একই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক লক্ষণ থাকা অংশগ্রহণকারীদের ৪২ শতাংশের বুক ধড়ফড় করার সমস্যা হয়েছিল। হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত বা সজোরে হলে অথবা মাঝেমধ্যে হৃদস্পন্দন মিস হয়ে যাওয়ার মতো মনে হলে এমনটি হতে পারে। 

৪. শ্বাসকষ্ট 

শ্বাসকষ্ট (ডিসপনিয়া) প্রায়ই হৃদরোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়। হাঁটার সময়, কোনো শারীরিক কাজ করার সময়, এমনকি বিশ্রামে থাকা অবস্থাতেও আপনার শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। এমন মনে হতে পারে যেন ফুসফুস পর্যাপ্ত বাতাস পাচ্ছে না। 

৫. বুকে জ্বালাপোড়া 

বুকে জ্বালাপোড়া করা আসন্ন হার্ট অ্যাটাকের আরেকটি সম্ভাব্য লক্ষণ। হৃদরোগজনিত বুকের জ্বালাপোড়া অনেকটাই গ্যাস্ট্রিক বা বুকজ্বালার (হার্টবার্ন) মতো অনুভূত হতে পারে। তাই লক্ষণগুলো কখন হচ্ছে তা খেয়াল রাখুন এবং নিয়মিত বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভূত হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

৬. অতিরিক্ত ক্লান্তি 

মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হতেই পারে, তবে মাত্রাতিরিক্ত ও অস্বাভাবিক ক্লান্তির অনুভূতি কোনো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আপনার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 

৭. মাথা ঘোরানো বা হালকা মাথা অনুভূত হওয়া 

মাঝে মাঝে আপনার মাথা ঘুরতে পারে, এমনকি অতীতে কখনো এমন সমস্যা না থাকলেও তা হতে পারে। হার্ট সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারায় মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে এই মাথা ঘোরার সমস্যা হতে পারে।

৮. বমি ভাব 

পেটে অস্বস্তি, বমি ভাব এবং বমি হওয়া হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে বমি ভাবের অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে না পেলে এই লক্ষণটি নজরে রাখুন। 

৯. উদ্বেগ 

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পূর্বলক্ষণ রয়েছে এমন রোগীদের ২৩ শতাংশই উদ্বেগে ভুগেছেন। হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায়ই সহাবস্থানকারী উদ্বেগ থাকে, যা রোগের অবনতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

১০. ঘুমের ব্যাঘাত 

অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা ঘুমানোর ঠিক আগে ক্যাফেইন গ্রহণসহ নানা কারণে ভালো ঘুম না হতে পারে। তবে কোনো কারণ ছাড়াই যদি নিয়মিত ঘুমের সমস্যা দেখা দেয়, তা হার্ট অ্যাটাকের সতর্কবার্তা হতে পারে। 

অনেক সময় হৃদরোগীরা শুয়ে থাকা অবস্থায় শ্বাসকষ্টে ভোগেন, যা তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। 

১১. ফোলাভাব 

মাঝে মাঝে পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতার ফোলাভাব হৃদরোগের লক্ষণ হতে পারে। শরীরে সঠিকভাবে রক্ত চলাচল না করলে রক্ত শিরায় জমে গিয়ে ফোলাভাব সৃষ্টি করতে পারে, যার সাধারণ জায়গা হলো পা ও গোড়ালি। 

১২. শরীরের অন্যান্য অংশে ব্যথা 

আশ্চর্যজনকভাবে, হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা কেবল বুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হাত, পিঠ, চোয়াল বা ঘাড়েও হতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের সময় তো বটেই, এমনকি তার আগের সপ্তাহগুলোতেও এই ব্যথা হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের আগে কেন লক্ষণ দেখা দেয়? 

হার্টে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় শরীর যখন সাড়া দেয়, তখনই মূলত হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে। করোনারি ধমনী (যে ধমনী হার্টে রক্ত বহন করে) তার দেওয়ালে ফ্যাট বা চর্বিযুক্ত কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম এবং প্রদাহজনক কোষ জমা হয়ে প্লাক তৈরি করতে পারে। এই প্লাক ফেটে গেলে করোনারি ধমনীর ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা হার্টে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে হার্ট অ্যাটাক ঘটাতে পারে। 

হার্ট অ্যাটাকের ঠিক আগের লক্ষণগুলো:

হার্ট অ্যাটাকের ঠিক আগের মুহূর্তে প্রতিটি মানুষের উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে, তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ প্রায় সবার ক্ষেত্রেই দেখা যায়। এগুলো হলো:

* বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে ব্যথা বা অস্বস্তি, যা কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে অথবা আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতে পারে।
* হালকা মাথা ঘোরানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়া। 
* অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। 
* পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা। 
* হাত বা কাঁধে অস্বস্তি। 
* শ্বাসকষ্ট।