বাংলাদেশে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা যকৃত প্রতিস্থাপন সেবায় নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)-এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে গত এক বছরে সফলভাবে ছয়টি লিভার প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন নিয়মিতভাবে এই সেবা চালু করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য গড়ে প্রতি মাসে দুটি, অর্থাৎ বছরে ২৪টি লিভার প্রতিস্থাপন।
বাংলাদেশে লিভার প্রতিস্থাপন একেবারে নতুন নয়। ২০১০ সালের জুনে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে দেশে প্রথম লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএমইউতেও এই চিকিৎসা শুরু হয়। ২০১৯ সালে বিএমইউ প্রথম এবং ২০২৩ সালে দ্বিতীয়বার লিভার প্রতিস্থাপন করে। কিন্তু এতদিন এটি নিয়মিত সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।
সাম্প্রতিক এক বছরে বিএমইউর ছয়টি সফল প্রতিস্থাপন সেই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছয়টি অস্ত্রোপচারের মধ্যে দুটি হয় ২০২৫ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর। পরবর্তী চারটি হয় ২০২৬ সালের ৩ ও ৪ জুলাই এবং ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর। বর্তমানে প্রতিস্থাপন করা রোগীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট ক্লিনিকের মাধ্যমে ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছয়টি প্রতিস্থাপনই সরকারি অর্থায়নে বিনা খরচে করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও চারজন রোগীকে পরবর্তী প্রতিস্থাপনের জন্য নির্বাচন ও প্রস্তুত করা হয়েছে। অক্টোবরের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে আরও দুটি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতিও চলছে বলে বিএমইউ জানিয়েছে।
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কোনো একক সার্জনের অস্ত্রোপচার নয়। এটি একটি অত্যন্ত জটিল ও সমন্বিত চিকিৎসাপদ্ধতি। রোগী নির্বাচন থেকে শুরু করে দাতা নির্ধারণ, অস্ত্রোপচার, অ্যানেসথেশিয়া, নিবিড় পরিচর্যা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ প্রতিটি ধাপেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বিএমইউর ছয়টি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে ১৯টি বিশেষায়িত বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি দল কাজ করেছে। হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি, হেপাটোলজি, অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এই কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়াটিক অ্যান্ড লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশন সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস, অধ্যাপক মহসেন চৌধুরী এবং সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা এই কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের জন্য এই সাফল্যের অর্থ শুধু ছয়টি সফল অস্ত্রোপচার নয়; বরং জটিল অঙ্গপ্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সমন্বিত চিকিৎসা কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এই সাফল্যের মানবিক দিকটি বোঝা যায় জোসনা বেগমের ঘটনা থেকে। ঢাকার বনশ্রীর এই গৃহিণী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবার বিদেশে চিকিৎসার কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু লিভার প্রতিস্থাপনের বিপুল খরচ তাঁদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের মাধ্যমে তাঁরা বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কথা জানতে পারেন। শেষ পর্যন্ত জোসনা বেগমই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বিএমইউর নতুন ভবনে পুনরায় চালু হওয়া লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রমের প্রথম রোগী হিসেবে প্রতিস্থাপন করান। তাঁর ছেলে সাদ্দাম চিকিৎসার পর মায়ের সফলভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্য আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছেন।
এ ধরনের একটি সফল অস্ত্রোপচার শুধু একজন রোগীর জীবন বাঁচানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। দেশে চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হলে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে এবং রোগীর চিকিৎসা ও পরবর্তী ফলোআপ একই স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যে রাখা সহজ হতে পারে।
লিভার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বড় একটি প্রশ্ন। বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশে একটি লিভার প্রতিস্থাপনের চিকিৎসা, রোগী ও দাতার যাতায়াত, থাকা, পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত আইসিইউ ব্যয়সহ মোট খরচ প্রায় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বিএমইউতে ভবিষ্যতে এই চিকিৎসার আনুমানিক খরচ ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। কার্যক্রম বাড়লে ব্যয় আরও কমতে পারে বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে বর্তমানে সম্পন্ন ছয়টি প্রতিস্থাপন সরকারি অর্থায়নে বিনা খরচে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, আরও কিছু সময় সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে সেবাটি নিয়মিত ও টেকসই করার পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিএমইউ এখন প্রতি মাসে গড়ে দুটি লিভার প্রতিস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ বছরে ২৪টি অস্ত্রোপচার। ছয়টি সফল অস্ত্রোপচারের পর এই লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে নিয়মিত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট চালু করতে শুধু অপারেশন থিয়েটার ও সার্জন থাকলেই হবে না। প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স, আধুনিক আইসিইউ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত ও রক্তজাতীয় উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ ব্যবস্থার।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দাতা ব্যবস্থাপনা। জীবিত দাতার ক্ষেত্রে দাতার নিরাপত্তা, উপযুক্ততা ও চিকিৎসাগত মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিস্থাপনের পর রোগীর শরীর যাতে নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান না করে, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণও প্রয়োজন।