রান্নাঘরের অতি পরিচিত একটি উপাদান রসুন। তরকারির স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই নানা স্বাস্থ্যগুণের জন্য এর কদর রয়েছে। বিশেষ করে সকালে খালি পেটে এক কোয়া কাঁচা রসুন খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। কেউ মনে করেন এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, কেউ আবার দাবি করেন এটি হৃদযন্ত্র ও হজমের জন্য দারুণ উপকারী। কিন্তু এসব দাবির মধ্যে কোনটির পেছনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে, আর কোনটি শুধু প্রচলিত ধারণা? চলুন জেনে নেওয়া যাক-
রসুনে থাকা অ্যালিসিনের রহস্য
রসুনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় যৌগ হলো অ্যালিসিন। কাঁচা রসুনের কোয়া থেঁতো বা কুচি করলে এর ভেতরের অ্যালিনেজ নামের একটি এনজাইমের মাধ্যমে অ্যালিসিন তৈরি হয়। এই কারণেই গোটা কোয়ার তুলনায় কাটা বা থেঁতো করা রসুনে এর বিশেষ যৌগ তৈরি হওয়ার সুযোগ বেশি। খালি পেটে এটি দ্রুত শোষিত হয়ে শরীরকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করে। এটি অনাক্রম্যতা বাড়িয়ে সর্দি-কাশির মতো সাধারণ সংক্রমণের তীব্রতা ও প্রকোপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারিতা
রসুন নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে হৃদ স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে। বিভিন্ন গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ধরনের রসুনজাত প্রস্তুতি কিছু মানুষের রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা সামান্য কমাতে সাহায্য করতে পারে। ২০২৫ সালের একটি বড় পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও রসুন গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপ, মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএল কোলেস্টেরলের কিছু উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। খালি পেটে খাওয়ার ফলে এর সক্রিয় উপাদানগুলো খুব শীঘ্রই রক্তপ্রদাহে প্রবেশ করে হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়?
রসুনকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর খাবার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়ভাবে প্রচার করা হয়। কিছু গবেষণায় সর্দি-কাশির মতো ওপরের শ্বাসনালির সংক্রমণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও প্রমাণ এখনও সীমিত। ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথও বলছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে মানুষের ওপর ভালো মানের গবেষণা এখনো খুব বেশি নেই।
হজমের ক্ষেত্রে ভূমিকা
কাঁচা রসুন আসলে পাচক এনজাইম নিঃসরণ বাড়ায় ও পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় করে, যা পেট ফাঁপা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করে। এর প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল পেটের ক্ষতিকর ব্যাকেটিরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করে। খাবারের আগে কাঁচা রসুন খেলে পৌষ্টিকতন্ত্র বেড়ে যায়, ফলে খাবার হজম প্রক্রিয়া বেশ উন্নত হয়। বেশি পরিমাণ কাঁচা রসুন খেলে অনেকের পেট জ্বালা, পেটব্যথা, গ্যাস, বমি ভাব বা অস্বস্তি হতে পারে। কাঁচা অবস্থায় এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আরও বেশি চোখে পড়তে পারে।
লিভার ‘ডিটক্স’ করে-দাবিটি কতটা ঠিক?
রসুন লিভারের প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, যা শরীর থেকে ক্ষতিকারক টক্সিন ও ভারী ধাতু বের করে দিতে সাহায্য করে। রসুনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান লিভারের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রতিদিন সকালে কাঁচা রসুন খেলে সুষম খাদ্যের পাশাপাশি শরীরের প্রাকৃতিক ডিটক্স প্রক্রিয়াও উন্নত হয়।
এছাড়া শরীরে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস বা প্রদাহের জন্য বার্ধক্য দ্রুত আসে ও বিভিন্ন ব্যাধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রসুনে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের স্বাস্থ্য ভাল থাকে, শরীরে শক্তি বাড়ে এবং দূর হয় নানা ধরণের দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল রোগের ঝুঁকিও।
সতর্ক থাকবেন যারা
সবার জন্য খালি পেটে কাঁচা রসুন উপযুক্ত নাও হতে পারে। যাদের গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি বা সংবেদনশীল পাকস্থলী রয়েছে, তাদের অস্বস্তি বাড়তে পারে। আবার রসুন রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কিছু ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। বিশেষ করে যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান বা অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের নিয়মিত বেশি পরিমাণ রসুন বা রসুনের সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাই রসুনকে ‘জাদুকরি ওষুধ’ না ভেবে সুষম খাবারের একটি অংশ হিসেবেই দেখা ভালো। কাঁচা রসুন খেতে ভালো লাগলে অল্প পরিমাণে খেতে পারেন।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস