মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা সাধারণত ঘুমের প্রস্তুতির সময় কমতে শুরু করে। রাতের মধ্যে তা আরও কমে এবং সাধারণত দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস নিচে নেমে যেতে পারে।
ঘুমের আগে শরীরের এই তাপমাত্রা হ্রাস স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ। ত্বকের রক্তনালির প্রসারণের মাধ্যমে শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যেতেও সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়া ঘুমিয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
বার্লিনের ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার অব স্লিপ মেডিসিনের ঘুমবিষয়ক চিকিৎসক ও গবেষক সেবাস্তিয়ান হারবার্গারের মতে, শোবার ঘর অতিরিক্ত গরম হলে ঘুম ছোট হয়ে যেতে পারে এবং বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এর কারণ হলো, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ও ঘুমের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত গরমে শরীর প্রয়োজনীয় তাপ বের করে দিতে না পারলে ঘুমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে।
ঘরের তাপমাত্রা নিয়ে কী বলছে গবেষণা?
২০০৭ সালের একটি গবেষণায় ঘুমের সময় ঘরের তাপমাত্রার ওঠানামা মানুষের ঘুমের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় একটি পরীক্ষায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঘরের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ধীরে ধীরে ২৪ ডিগ্রিতে নামানো হয়। এরপর ভোর ৩টা থেকে সকাল ৭টার মধ্যে তাপমাত্রা আবার বাড়িয়ে ২৭ ডিগ্রিতে নেওয়া হয়। অন্য পরীক্ষায় ঘরের তাপমাত্রা পুরো সময় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, তাপমাত্রার স্বাভাবিক ওঠানামার মধ্যে ঘুমানো অংশগ্রহণকারীদের রাতে মেলাটোনিনের একটি সূচক তুলনামূলক বেশি ছিল। তাঁরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেদের আরও সতেজ বলেও অনুভব করেন।
গবেষকেরা আরও লক্ষ করেন, তাপমাত্রা ওঠানামা করা পরিবেশে অংশগ্রহণকারীদের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা রাতের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর সময় গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা এগিয়ে আসে।
এই ফলাফল থেকে ধারণা করা যায়, শোবার ঘরের তাপমাত্রা শুধু আরামদায়ক ঘুমেই নয়, শরীরের দৈনিক ছন্দের সময় নির্ধারণেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে গবেষণাটি সীমিত পরিসরের হওয়ায় এ থেকে সবার জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বা একই ধরনের ফল নিশ্চিত করা যায় না।
শরীরের জৈবঘড়ি কীভাবে কাজ করে?
মানুষের শরীরের ২৪ ঘণ্টার ছন্দকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ি। এটি ঘুম ও জাগরণ ছাড়াও হরমোন নিঃসরণ, শরীরের তাপমাত্রা, বিপাকক্রিয়া এবং সতর্কতার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কাডিয়ান নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক রাসেল ফস্টারের মতে, ঘুমের আগে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে জৈবঘড়ির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে তাপমাত্রা নিজেও জৈবঘড়িকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ফলের মাছিসহ বিভিন্ন প্রাণীর দৈনিক ছন্দ তাপমাত্রার নিয়মিত ওঠানামার মাধ্যমে প্রভাবিত করা সম্ভব। মানবকোষের ওপর পরীক্ষাতেও কৃত্রিমভাবে শরীরের তাপমাত্রার পরিবর্তন অনুকরণ করে অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ির কার্যক্রমে প্রভাব দেখা গেছে।
কিন্তু প্রাণী বা কোষের পরীক্ষায় পাওয়া ফল সরাসরি মানুষের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা যায় না। মানুষের ঘুমের সময় নির্ধারণে তাপমাত্রার স্বাধীন ভূমিকা কতটা, তা বোঝার জন্য আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।
তাপমাত্রা কি আলোর বিকল্প হতে পারে?
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাসের ঘুমবিষয়ক গবেষক জেরোম সিগেল মনে করেন, ঘুমের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার গুরুত্ব প্রচলিত ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে। তাঁর মতে, আধুনিক জীবনে ঘরবাড়ির তাপমাত্রা দিন-রাত প্রায় একই রাখার অভ্যাস মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের পরিবেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
তবে বাসেলের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রোনোবায়োলজিস্ট ক্রিশ্চিয়ান কাজোখেন মনে করেন, তাপমাত্রা জৈবঘড়ির ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু এখনই একে আলোর বিকল্প বলা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে মানুষের ওপর গবেষণার সংখ্যা খুবই সীমিত।
১৯৭৪ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, অংশগ্রহণকারীরা ঘুমের সময় জেগে থাকার সময়ের তুলনায় ঘরের তাপমাত্রা প্রায় ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস কমিয়ে রাখলে তাঁদের ঘুম-জাগরণের চক্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ মিনিট বেড়ে যায়। তবে এই ফলাফল আধুনিক গবেষণার মানদণ্ডে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, তাপমাত্রা মানুষের ঘুমের সময়কে প্রভাবিত করতে পারে—এমন কিছু প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু শুধু ঘরের তাপমাত্রা পরিবর্তন করে নিজের জৈবঘড়ি নির্ভরযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘুম নিয়ন্ত্রণে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা
মানুষ কখন ঘুমাবে এবং কতটা ঘুম পাবে, তা মূলত দুটি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।
প্রথমটি হলো স্লিপ হোমিওস্ট্যাট। যত বেশি সময় মানুষ জেগে থাকে, তত বেশি ঘুমের চাপ তৈরি হয়। দ্বিতীয়টি হলো সার্কাডিয়ান রিদম, যা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে এবং অন্য সময়ে সজাগ থাকতে সাহায্য করে।
এর পাশাপাশি রয়েছে মস্তিষ্কের সজাগতা বজায় রাখার ব্যবস্থা। বিপদ, শব্দ বা মানসিক উত্তেজনা থাকলে ঘুমের চাপ থাকা সত্ত্বেও মানুষ জেগে উঠতে পারে।
এই ব্যবস্থাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই গরম ঘরে ঘুমের সমস্যা হলে তার কারণ শুধু জৈবঘড়ি নয়; শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের অস্বস্তি কিংবা অন্য শারীরবৃত্তীয় কারণও হতে পারে।
ভালো ঘুমের জন্য কী করা যেতে পারে?
গবেষণার বর্তমান অবস্থায় ঘুমের জন্য সবার উপযোগী একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু সাধারণ অভ্যাস সহায়ক হতে পারে:
আরামদায়ক শোবার ঘর: ঘর অতিরিক্ত গরম হলে পাখা, উপযুক্ত বায়ু চলাচল বা নিরাপদ শীতলীকরণের ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল: বাইরের বাতাস ঠান্ডা ও পরিষ্কার থাকলে এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যা না থাকলে জানালা খুলে রাখা যেতে পারে।
নিয়মিত ঘুমের সময়: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠা শরীরের দৈনিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
আলোর দিকে খেয়াল রাখা: দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো গ্রহণ এবং রাতে উজ্জ্বল আলো কমানো ঘুম-জাগরণের ছন্দ বজায় রাখতে সহায়ক।
নিজের আরামকে গুরুত্ব দেওয়া: ঘর এত ঠান্ডা করা উচিত নয় যে কাঁপুনি, অস্বস্তি বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
এগুলো সাধারণ ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি; নির্দিষ্ট তাপমাত্রার চিকিৎসাগত প্রেসক্রিপশন নয়।