পুরোনো আঘাতের ব্যথা ফিরে এলে কী করবেন?

খেলাধুলার সময় হাঁটু, গোড়ালি কিংবা কাঁধে পাওয়া আঘাত সেরে যাওয়ার পর অনেকেই মনে করেন, সমস্যা আর নেই। কিন্তু কয়েক বছর পর দীর্ঘক্ষণ হাঁটলে হাঁটুতে ব্যথা, ঘুম থেকে ওঠার পর গোড়ালি শক্ত হয়ে থাকা কিংবা জিমে ব্যায়াম শুরু করলে কাঁধে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব সমস্যার সঙ্গে পুরোনো স্পোর্টস ইনজুরির সম্পর্ক থাকতে পারে।

পুরোনো আঘাতের কারণে কোনো জোড়ার স্বাভাবিক নড়াচড়া, শরীরের ওজন বহনের ক্ষমতা কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বদলে যেতে পারে। আঘাতের সময়কার ব্যথা চলে গেলেও তরুণাস্থি, লিগামেন্ট বা জোড়ার অন্যান্য অংশে হওয়া ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে নতুন সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

পুরোনো আঘাতের সমস্যা আবার দেখা দেয় কেন?

লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়া, তরুণাস্থিতে আঘাত, হাড় ভাঙা কিংবা একই জোড়ায় বারবার আঘাত লাগলে সেখানে চাপ বণ্টনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। চিকিৎসার পর স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা সম্ভব হলেও জোড়াটি আগের মতো সম্পূর্ণ কার্যকর নাও হতে পারে।

এর একটি উদাহরণ হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএল (ACL) ইনজুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁদের এসিএল ইনজুরি হয়, তাঁদের পরবর্তী সময়ে হাঁটুতে অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা ক্ষয়জনিত জোড়ার রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। হাঁটুর মেনিসকাস নামের তরুণাস্থিতে আঘাত লাগলেও এ ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে লিগামেন্টের ক্ষতি বা অস্ত্রোপচারের সঙ্গে এ ধরনের আঘাত যুক্ত থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

তাই আঘাতের পর কয়েক বছর ভালো থাকার পরও শারীরিক পরিশ্রম বাড়ালে ব্যথা দেখা দিতে পারে। আবার দৌড়ানো শুরু করা, নতুন করে খেলাধুলায় ফেরা, শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা নিয়মিত সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার কারণেও পুরোনো সমস্যাটি সামনে আসতে পারে।

আঘাতের পর চলাফেরার ধরন বদলে যেতে পারে

কোনো জোড়ায় আঘাত পেলে শরীর অনেক সময় অজান্তেই চলাফেরার ধরন বদলে নেয়। যেমন, এক পায়ে তুলনামূলক কম ভর দেওয়া, হাঁটু পুরোপুরি ভাঁজ না করা কিংবা অন্য পেশির ওপর বেশি নির্ভর করার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।

ব্যথা ও ফোলা কমে যাওয়ার পরও এসব পরিবর্তন থেকে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, গোড়ালি মচকে যাওয়ার পর গোড়ালির নড়াচড়া সীমিত হয়ে যেতে পারে অথবা শরীরের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এর প্রভাব হাঁটা কিংবা ব্যায়ামের সময় হাঁটু ও নিতম্বের নড়াচড়াতেও পড়তে পারে।

এ কারণে ব্যথা না থাকলেই যে জোড়ার কার্যক্ষমতা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়?

পুরোনো আঘাত পাওয়া জোড়ায় বারবার ব্যথা হলে এবং নির্দিষ্ট কাজের পর সেই ব্যথা ফিরে এলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখা জরুরি, সেগুলো হলো—

  • ব্যায়াম বা খেলাধুলার পর জোড়া ফুলে যাওয়া।
  • দীর্ঘ সময় ধরে জোড়ায় শক্তভাব বা জড়তা থাকা।
  • নড়াচড়ার সময় জোড়ায় আটকে যাওয়ার অনুভূতি হওয়া।
  • হাঁটু বা গোড়ালি বারবার বেঁকে যাওয়া কিংবা ভরসা হারানোর মতো অনুভূতি হওয়া।
  • জোড়ার স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যাওয়া।
  • অল্প পরিশ্রমেই ব্যথা শুরু হওয়া বা সময়ের সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকা।

ব্যথার ধরন ও কখন তা দেখা দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, তিন কিলোমিটার দৌড়ানোর পর প্রতিবার হাঁটুতে ব্যথা হলে কিংবা দীর্ঘক্ষণ ব্যাডমিন্টন খেলার পর গোড়ালি ফুলে গেলে বিষয়টি লক্ষ করা উচিত। কখন ব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে এবং ফোলা দেখা দিচ্ছে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসককে সমস্যার কারণ বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভেবে বারবার ফিরে আসা ব্যথা উপেক্ষা করা ঠিক নয়।

বড় সমস্যা এড়াতে কী করবেন?

দীর্ঘ বিরতির পর খেলাধুলায় ফিরলে শুরুতেই আগের মতো কঠোর অনুশীলন করা উচিত নয়। ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সময় ও তীব্রতা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে পেশি ও জোড়াগুলো নতুন চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।

জোড়ার চারপাশের পেশি শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে জোড়ার স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে এবং নড়াচড়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ উন্নত হয়। হাঁটুর ক্ষেত্রে উরুর সামনের ও পেছনের পেশি এবং নিতম্বের পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। গোড়ালিতে পুরোনো আঘাত থাকলে পায়ের পেশির শক্তি ও ভারসাম্য বাড়ানোর ব্যায়ামও প্রয়োজন হতে পারে।

জোড়ার স্বাভাবিক নড়াচড়া বজায় রাখাও জরুরি। কোনো জোড়ায় শক্তভাব তৈরি হলে তা শরীরের অন্য অংশের নড়াচড়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শে জোড়ার নড়াচড়ার সীমা, পেশির দুর্বলতা ও চলাফেরার ধরন মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

শরীরের ওজনও হাঁটু ও নিতম্বের মতো ওজন বহনকারী জোড়ায় চাপের ওপর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত ওজন থাকলে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের পরামর্শে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বারবার জোড়া ফুলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

শারীরিক পরিশ্রমের পর জোড়া ফুলে যাওয়া ভেতরের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে ফোলার সঙ্গে জোড়া আটকে যাওয়া, অস্থিতিশীলতা বা তীব্র ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিকভাবে শারীরিক পরীক্ষা করে চিকিৎসক সমস্যার ধরন বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। উপসর্গ ও আগের আঘাতের ইতিহাস অনুযায়ী এক্স-রে বা অন্য কোনো ইমেজিং পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। তবে পুরোনো স্পোর্টস ইনজুরি থাকলেই এমআরআই বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হবে, এমন নয়। বর্তমান উপসর্গ ও পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হয়।

মূল লক্ষ্য হলো, বহু বছর আগের আঘাতের চিকিৎসা নিয়ে পড়ে না থেকে বর্তমানে জোড়ায় কী সমস্যা হচ্ছে, তা শনাক্ত করা।

দীর্ঘ বিরতির পর খেলাধুলায় ফিরবেন যেভাবে

অনেক দিন খেলাধুলা থেকে দূরে থাকার পর আগের ফিটনেসের ওপর নির্ভর করে অনুশীলনের মাত্রা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। পেশি, জোড়া ও শরীরের ভারসাম্যকে আবার আগের কাজের উপযোগী হতে সময় দিতে হবে।

তীব্র ব্যায়ামের আগে ওয়ার্মআপ করুন। খেলাধুলার অনুশীলনের পাশাপাশি পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম চালিয়ে যান। ব্যথা বারবার ফিরে এলে জোড়াটিকে পরীক্ষা করার জন্য বারবার চাপ না দিয়ে বিশ্রাম নিন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দশ বছর আগের কোনো স্পোর্টস ইনজুরির সঙ্গে বর্তমান ব্যথার সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। তবে একই জোড়ায় বারবার ব্যথা, ফোলা বা অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে পুরোনো আঘাতের ইতিহাস চিকিৎসককে জানানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শনাক্ত করে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে সমস্যাটি দৈনন্দিন জীবন ও খেলাধুলায় বড় বাধা হয়ে ওঠার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে।

সূত্র: এনডিটিভি