দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারে শরীরের কী ক্ষতি হয়?

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

স্মার্টফোন এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। কাজ, যোগাযোগ, বিনোদন কিংবা সংবাদ পড়া—সবকিছুতেই এর ব্যবহার। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ আটকে রাখলে শরীর ও মনের ওপর পড়তে পারে নানা বিরূপ প্রভাব।

ঘুম থেকে উঠেই মোবাইল হাতে নেওয়া, দিনের বড় একটি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানো, কাজের ফাঁকে বারবার ফোন দেখা, এমনকি ঘুমাতে যাওয়ার আগমুহূর্তেও স্ক্রিনে চোখ রাখা—এ যেন আধুনিক জীবনের পরিচিত চিত্র। অনেকেই বুঝতে পারেন না, কখন প্রয়োজনীয় ব্যবহার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, আর সেই অভ্যাস ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপনের ছন্দ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারের কারণে চোখের ক্লান্তি, মাথাব্যথা, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, ঘুমের সমস্যা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। তবে এসব সমস্যা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে হয় না। ব্যবহারের সময়, স্ক্রিনের দূরত্ব, বসার ভঙ্গি এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে।

চোখের ওপর বাড়তি চাপ

দীর্ঘক্ষণ মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের স্বাভাবিক বিশ্রাম ব্যাহত হয়। স্ক্রিনে মনোযোগ ধরে রাখার সময় অনেকেই স্বাভাবিকের তুলনায় কম পলক ফেলেন। ফলে চোখের আর্দ্রতা কমে গিয়ে শুষ্কতা তৈরি হতে পারে।

এর কারণে চোখ জ্বালাপোড়া, চুলকানি, লাল হওয়া, পানি পড়া, ঝাপসা দেখা কিংবা চোখে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। কখনো কখনো মাথাব্যথা ও মনোযোগ ধরে রাখতেও সমস্যা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের সমস্যাকে সাধারণভাবে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা ডিজিটাল চোখের ক্লান্তি বলা হয়।

আমেরিকান একাডেমি অব অফথালমোলজির তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘক্ষণ ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারে চোখে অস্বস্তি ও সাময়িক দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা হতে পারে। তবে স্বাভাবিক স্ক্রিন ব্যবহারে চোখ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যায়—এমন ধারণার পক্ষে প্রমাণ নেই। 

ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে ব্যথা

মোবাইল ব্যবহারের সময় অনেকেই মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন। কেউ বিছানায় শুয়ে, কেউ সোফায় হেলান দিয়ে, আবার কেউ এক হাতে ফোন ধরে অন্য হাতে কাজ করতে করতে সময় কাটান। এসব অবস্থায় শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি নষ্ট হতে পারে।

বিশেষ করে মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখলে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে বাড়তি চাপ পড়ে। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে থাকলে ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধ শক্ত হয়ে যাওয়া এবং পিঠের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা কমাতে ফোন চোখের কাছাকাছি উচ্চতায় ধরে ব্যবহার করা, পিঠ সোজা রাখা এবং নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করা জরুরি। একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ানোও উপকারী।

ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে

রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কেউ ভিডিও দেখেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করেন, আবার কেউ সংবাদ বা বার্তা পড়তে পড়তে রাত পার করেন।

সমস্যা হলো, স্ক্রিনের আলো এবং উত্তেজনাপূর্ণ বা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী কনটেন্ট ঘুমের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বারবার নোটিফিকেশন আসা কিংবা নতুন কিছু দেখার আগ্রহও ঘুমাতে যাওয়ার সময় পিছিয়ে দেয়।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন ব্যবহার এবং বিশেষ করে ঘুমের আগে ডিজিটাল কনটেন্ট দেখা ঘুমের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রমাণ তুলনামূলকভাবে অনিশ্চিত। 

তাই ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমানো, ফোন নীরব রাখা এবং শোবার ঘরে ফোনের ব্যবহার সীমিত করা ভালো অভ্যাস হতে পারে।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি

মোবাইলের পর্দায় দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে হাঁটাচলা, খেলাধুলা কিংবা শরীরচর্চার সময় কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দিনের বড় অংশ বসে থেকে মোবাইল ব্যবহার করেন, তাঁদের দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শারীরিক পরিশ্রম কমে গেলে ওজন বৃদ্ধি, পেশির দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন জীবনযাপনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। অবশ্য এসব সমস্যার জন্য শুধু মোবাইলকে দায়ী করা যায় না; খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, বয়স ও সামগ্রিক জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক চাপ ও মনোযোগের সমস্যা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত নতুন তথ্য, ছবি, ভিডিও ও মন্তব্য দেখার অভ্যাস অনেকের মনোযোগকে খণ্ডিত করতে পারে। বারবার ফোনের নোটিফিকেশন পরীক্ষা করার প্রবণতা কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে।

অন্যের জীবনযাপন, সাফল্য কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কেউ কেউ হতাশা বা মানসিক চাপ অনুভব করেন। নেতিবাচক সংবাদ, অনলাইন বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরূপ মন্তব্যও মানসিক অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

তবে মোবাইল ব্যবহার করলেই মানসিক সমস্যা তৈরি হয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কী ধরনের কনটেন্ট দেখা হচ্ছে, কতক্ষণ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ব্যক্তির মানসিক অবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের পরিচিত অভ্যাস। খাবার খাওয়ানো, কান্না থামানো কিংবা অবসর কাটানোর জন্য অনেক সময় ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা তাদের ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে।

শিশুদের বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা, বাইরে খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে উৎসাহিত করা জরুরি। অভিভাবকদের নিজেদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাসেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ শিশুরা বড়দের আচরণ দেখেই অনেক অভ্যাস শেখে।

মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতি কমাবেন যেভাবে

মোবাইল পুরোপুরি বাদ দেওয়া বর্তমান সময়ে বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার এবং কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি কার্যকর।

১. ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করুন: প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন দেখার পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান। এতে চোখের একটানা কাছের দিকে তাকিয়ে থাকার চাপ কমাতে সাহায্য হয়। 

২. চোখের উপযোগী দূরত্ব বজায় রাখুন: ফোন খুব কাছে এনে ব্যবহার করবেন না। অক্ষর ছোট হলে চোখ কুঁচকে না তাকিয়ে লেখার আকার বাড়িয়ে নিন।

৩. স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ঠিক রাখুন: আশপাশের আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা নির্ধারণ করুন। অন্ধকার ঘরে অতিরিক্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

৪. ঘুমের আগে ফোন দূরে রাখুন: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে চলুন।

৫. বসার ভঙ্গি ঠিক রাখুন: মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ ফোন দেখবেন না। পিঠ সোজা রাখুন এবং ফোন এমনভাবে ধরুন, যাতে ঘাড়ে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

৬. নিয়মিত হাঁটুন ও শরীরচর্চা করুন: দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বিরতি নিন। হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম এবং বাইরে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

৭. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন: প্রয়োজন নেই এমন অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন। নির্দিষ্ট সময় ছাড়া বারবার ফোন পরীক্ষা করার অভ্যাস কমান।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মোবাইল ব্যবহারের পর চোখে সাময়িক ক্লান্তি বা ঘাড়ে অস্বস্তি হলে বিরতি নেওয়া এবং ব্যবহারের অভ্যাস পরিবর্তন করা উপকারী হতে পারে। তবে চোখে নিয়মিত ঝাপসা দেখা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অতিরিক্ত লাল হওয়া, আলো সহ্য করতে না পারা কিংবা মাথাব্যথা চলতে থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে ঘাড় বা পিঠের ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

প্রযুক্তি নয়, নিয়ন্ত্রণের অভাবই বড় সমস্যা

স্মার্টফোন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। মুহূর্তের মধ্যে তথ্য পাওয়া, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, কাজের গতি বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই এর অবদান রয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গিয়ে যদি ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা, চোখের বিশ্রাম ও পারিবারিক সময় হারিয়ে যায়, তাহলে সেই সুবিধাই একসময় অসুবিধার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সচেতন ব্যবহার। কখন ফোন হাতে নিতে হবে, কতক্ষণ ব্যবহার করতে হবে এবং কখন সেটি সরিয়ে রেখে নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিতে হবে—এই নিয়ন্ত্রণটুকুই সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এমএজেড
আরও পড়ুন
সর্বশেষপঠিত