ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে মোবাইল রাখা কী নিরাপদ?

ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে কিংবা মাথার কাছে মোবাইল ফোন রেখে ঘুমানোর অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কেউ সকালে অ্যালার্ম বাজার জন্য ফোন কাছে রাখেন, কেউ ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখেন, আবার কেউ জরুরি কল বা বার্তার অপেক্ষায় ফোন হাতের কাছে রাখেন। তবে প্রশ্ন হলো, ঘুমের সময় মোবাইল ফোন কাছে রাখলে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় কি না?

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—মোবাইল ফোন থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ এবং ঘুমের আগে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস। বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণায় মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের স্বাভাবিক মাত্রার সংস্পর্শে থাকলে গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা হয়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে রাতে ফোন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করতে পারে।

মোবাইল ফোনের বিকিরণ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

মোবাইল ফোন সেল টাওয়ার, ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ও ব্লুটুথ ডিভাইসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (আরএফ) তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে। এই তরঙ্গকে আয়নন-অক্ষম বিকিরণ বলা হয়। এক্স-রের মতো আয়ননকারী বিকিরণের তুলনায় এর শক্তি কম; এটি সরাসরি একইভাবে ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে না।

ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শে শরীর কতটা শক্তি শোষণ করে, তা পরিমাপের একটি পদ্ধতি হলো স্পেসিফিক অ্যাবজর্পশন রেট (এসএআর)। আধুনিক মোবাইল ফোন সাধারণত নির্ধারিত বিকিরণ-নিরাপত্তা মান মেনে তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ ধরনের মান নির্ধারণ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে। এখন পর্যন্ত মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের কারণে গুরুতর রোগ হয়—এমন চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ এবং নির্দিষ্ট ধরনের মস্তিষ্কের ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বিকিরণকে ‘সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ শ্রেণিতে রেখেছে। এর অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেই ক্যানসার হবে; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি নাকচ করার মতো প্রমাণ তখনও পর্যাপ্ত ছিল না।

ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কেন ক্ষতিকর হতে পারে?

ঘুমের সময় ফোন পাশে রাখার চেয়ে ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ ফোন ব্যবহার ঘুমের ওপর বেশি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ফোনের পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

রাতে উজ্জ্বল পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলে মেলাটোনিন নামের ঘুম-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এতে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে এবং শরীরের স্বাভাবিক সার্কাডিয়ান ছন্দ বা জৈবঘড়ি প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করার অভ্যাস ঘুমের মান কমাতে পারে।

এ ছাড়া ফোনের নোটিফিকেশন, রিংটোন, কম্পন কিংবা হঠাৎ জ্বলে ওঠা পর্দা ঘুমের মধ্যে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এসব কারণে রাতে বারবার ঘুম ভাঙলে সকালে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।

ঘুমের সময় ফোন নিরাপদে রাখার উপায়

  • ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন পুরোপুরি বাদ দেওয়া জরুরি নয়। তবে কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুমের ব্যাঘাত কমানো যায়।
  • বিছানা থেকে দূরে রাখুন: ফোনটি বালিশের পাশে না রেখে বিছানা থেকে কিছুটা দূরে টেবিলে রাখুন। এতে রাতে বারবার ফোন দেখার প্রবণতা কমতে পারে।
  • এয়ারপ্লেন মোড চালু করুন: রাতে ফোনে সেলুলার নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখতে এয়ারপ্লেন মোড ব্যবহার করা যায়। এতে বেতার যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। তবে ওয়াই-ফাই বা ব্লুটুথ আলাদাভাবে চালু করলে সেগুলোর সংকেত চালু থাকতে পারে।
  • ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার কমান: সম্ভব হলে ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখুন। এর পরিবর্তে বই পড়া বা শান্ত কোনো কাজে সময় কাটাতে পারেন।
  • নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন: ডু নট ডিস্টার্ব মোড চালু করলে কল, বার্তা ও অ্যাপের নোটিফিকেশনের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত কমতে পারে।
  • অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করুন: শুধু সকালে ওঠার জন্য ফোন কাছে রাখলে সাধারণ অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
  • বিকিরণ ঠেকানোর পণ্য নিয়ে সতর্ক থাকুন: ইএমএফ-প্রতিরোধী কভার বা শিল্ডের কার্যকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই এসব পণ্যকে সুরক্ষার নিশ্চিত উপায় মনে করা ঠিক নয়।

তাহলে ঘুমের সময় ফোন পাশে রাখা কি বিপজ্জনক?

বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অনুযায়ী, মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শে থাকার কারণে ঘুমের সময় ফোন পাশে রাখলেই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তবে ফোনের আলো, শব্দ, কম্পন এবং ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে।

তাই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং ফোনটি বালিশ থেকে দূরে রাখার মতো অভ্যাস ঘুমের মান ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।

সূত্র: আমেরিকান অনকোলজি