সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় বসে খাবার খাওয়া অনেকের কাছেই আরামদায়ক অভ্যাস। কেউ টেলিভিশন দেখতে দেখতে রাতের খাবার খান, কেউ আবার অসুস্থতা বা ক্লান্তির কারণে বিছানাতেই খাবার খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু বিছানায় বসে খাওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর? এতে কি হজমের সমস্যা, গ্যাস বা অ্যাসিডিটি বাড়ে?
চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য বলছে, বিছানায় বসে খাওয়াটাই সরাসরি কোনো রোগের কারণ, এমন সিদ্ধান্তের যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে খাওয়ার সময় শরীরের অবস্থান, খাবারের পরপরই শুয়ে পড়া এবং বিছানার পরিচ্ছন্নতা স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
১. খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে বাড়তে পারে অ্যাসিডিটি
বিছানায় বসে খাওয়ার সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো- খাওয়ার পর শরীরের অবস্থান কী থাকছে। খাওয়ার পরপরই পুরোপুরি শুয়ে পড়লে পাকস্থলীর খাবার ও অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসার প্রবণতা বাড়তে পারে। একে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বলা হয়। এর ফলে বুকজ্বালা, টক ঢেকুর, গলায় জ্বালাপোড়া কিংবা মুখে টক স্বাদ অনুভূত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেসের (NIDDK) পরামর্শ অনুযায়ী, যাদের রাতে বা শোয়ার সময় অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা হয়, তাদের শোয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে খাবার খাওয়া উপকারী হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই সমস্যা দেখা দেয় না। যাদের আগে থেকেই অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) রয়েছে, তাদের সতর্ক থাকা বেশি জরুরি।
২. ভুল ভঙ্গিতে খেলে খাবার গিলতে সমস্যা হতে পারে
খাওয়ার সময় শরীর সোজা রাখা শুধু আরামের বিষয় নয়; খাবার চিবানো ও গেলার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিছানায় হেলান দিয়ে, আধশোয়া অবস্থায় বা ঘাড় অতিরিক্ত বাঁকিয়ে খেলে কিছু মানুষের খাবার গিলতে অসুবিধা হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, স্ট্রোকের রোগী কিংবা যাদের গিলতে সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাবার শ্বাসনালিতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনা করতে হয়।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যতথ্যে খাবার ও পানীয় গ্রহণের সময় সোজা হয়ে বসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিছানায় খেতে হলে বালিশের সাহায্যে শরীরকে যথাসম্ভব সোজা ও স্থিতিশীল রাখতে বলা হয়। খাবার গিলতে গিয়ে বারবার কাশি, দম আটকে আসা বা খাবার গলায় আটকে থাকার অনুভূতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. খাবার খেতে খেতে শুয়ে পড়ার অভ্যাস
অনেকে বিছানায় বসে খেতে খেতে একসময় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়েন। বিশেষ করে রাতে ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস থাকলে অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা বাড়তে পারে। মার্কিন স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা MedlinePlus এবং NIDDK দুটিই রিফ্লাক্সের উপসর্গ কমাতে খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ার পরামর্শ দেয়। তাই বিছানায় বসে খাবার খেলেও খাওয়ার পর সোজা হয়ে বসে থাকা বা স্বাভাবিকভাবে সোজা অবস্থায় থাকা ভালো। বিশেষত রাতে খাবার খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়া এড়িয়ে চলা উচিত।
৪. বিছানায় খাবার খেলে পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হতে পারে
বিছানায় নিয়মিত খাবার খাওয়ার আরেকটি দিক হলো পরিচ্ছন্নতা। খাবারের কণা, ঝরে পড়া তরল কিংবা মিষ্টি খাবারের অবশিষ্টাংশ বিছানার চাদর ও গদিতে জমতে পারে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে পিঁপড়া, তেলাপোকা বা অন্য পোকামাকড় আকৃষ্ট হতে পারে। আর্দ্রতা জমে থাকলে কাপড় ও গদিতে দুর্গন্ধ বা ছত্রাকের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এছাড়া বিছানায় খাবার খাওয়ার সময় খাবার ছড়িয়ে পড়লে বিছানার চাদর, বালিশ ও আশপাশের জায়গা অপরিষ্কার হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের বিছানায় খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এগুলো বিছানায় খাওয়ার সরাসরি শারীরিক রোগের প্রমাণ নয়; বরং পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত বাস্তব সমস্যা।
৫. মনোযোগ না দিয়ে খেলে বেশি খাওয়া হতে পারে?
বিছানায় বসে খাবার খাওয়ার সময় অনেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, টেলিভিশন দেখেন বা ভিডিওতে মনোযোগ দেন। এতে খাবারের প্রতি মনোযোগ কমে যেতে পারে। খাওয়ার সময় নিজের ক্ষুধা ও পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি খেয়াল না করলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে। তবে এ সমস্যা শুধু বিছানায় খাওয়ার কারণে হয় না; খাবারের সময় অতিরিক্ত মনোযোগ-বিভ্রান্তি থাকলেও এমনটি ঘটতে পারে। তাই ধীরে ধীরে খাওয়া, খাবার ভালোভাবে চিবানো এবং পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি বুঝে খাওয়া ভালো অভ্যাস।
৬. অসুস্থ ব্যক্তিরা বিছানায় খেলে কী করবেন?
জ্বর, দুর্বলতা, অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠা কিংবা চলাফেরায় অক্ষমতার কারণে অনেকের বিছানায় বসে খাবার খাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। তাদের জন্য বিছানায় খাওয়া নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়। তবে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা উচিত:
বালিশ বা উপযুক্ত সহায়তা দিয়ে শরীর সোজা রাখুন। সম্ভব হলে কোমর ও পিঠ স্থিতিশীল রেখে বসুন। খুব বেশি হেলান দিয়ে বা শুয়ে খাবার খাবেন না। খাওয়ার সময় তাড়াহুড়া না করে ধীরে ধীরে খাবার চিবিয়ে গিলুন। খাবার শেষে চাদর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। গিলতে সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
যাদের গিলতে গুরুতর সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য সাধারণ পরামর্শ যথেষ্ট নাও হতে পারে। তাদের ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে খাবার গ্রহণের নিরাপদ ভঙ্গি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তাহলে কি বিছানায় বসে খাওয়া একেবারেই বাদ দিতে হবে?
না। সুস্থ একজন ব্যক্তি বিছানায় বসে সোজা অবস্থায় খাবার খেলে শুধু সেই কারণে তার হজমের সমস্যা বা অন্য কোনো রোগ হবে এমন প্রমাণ নেই। মূল বিষয় হলো খাওয়ার সময় শরীরের ভঙ্গি, খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস এবং পরিচ্ছন্নতা। নিয়মিত খাবার খাওয়ার জন্য টেবিল-চেয়ার ব্যবহার করলে শরীর সোজা রাখা এবং খাবারের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সহজ হতে পারে। তবে অসুস্থতা বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিছানায় খেতে হলে উপযুক্ত সহায়তা নিয়ে নিরাপদভাবে খাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা: বিছানায় বসে খাওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে খাচ্ছেন এবং খাওয়ার পর কী করছেন। খাবারের পরপরই শুয়ে পড়া এড়িয়ে চলুন, শরীর সোজা রাখুন এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। নিয়মিত বুকজ্বালা, খাবার গিলতে সমস্যা বা অন্য কোনো অস্বস্তি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।