খাবার খাওয়ার আগে এক চামচ অলিভ অয়েল পান করলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ঠেকানো যায়—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। হৃদ্স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার জন্য অলিভ অয়েলের উপকারিতার কথা বহুদিন ধরেই আলোচিত। তবে খাবারের আগে সরাসরি অলিভ অয়েল পান করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যায় কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
সম্প্রতি ইঁদুরের ওপর চালানো একটি গবেষণার ফল নতুন করে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্লুকোজ দেওয়ার ১৫ মিনিট আগে অলিভ অয়েল খাওয়ানো ইঁদুরের রক্তে শর্করার মাত্রা প্রাথমিক পর্যায়ে তুলনামূলক কম বেড়েছে। অন্যদিকে, যেসব ইঁদুরকে আগে পানি দেওয়া হয়েছিল অথবা গ্লুকোজের পরে তেল দেওয়া হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে এমন ফল দেখা যায়নি।
তবে গবেষণায় শুধু অলিভ অয়েল নয়, অন্য ধরনের খাদ্যতেলেও একই রকম প্রভাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, রক্তে শর্করা বৃদ্ধির গতি কমানোর ক্ষেত্রে অলিভ অয়েলের একক কোনো বিশেষ ভূমিকা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কেন কমে রক্তে শর্করা বৃদ্ধির প্রাথমিক গতি?
খাবারের অধিকাংশ কার্বোহাইড্রেট ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়। তবে চর্বিজাতীয় খাবার পাকস্থলী থেকে খাদ্য অন্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর করে দিতে পারে। ফলে খাবার থেকে গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করে তুলনামূলক ধীরে। এতে খাবারের পরপরই রক্তে শর্করা বৃদ্ধির মাত্রা কম দেখা যেতে পারে। তবে কার্বোহাইড্রেট ও এর ক্যালরি শরীরে শোষিত হওয়া বন্ধ হয় না; শুধু শোষণের সময় কিছুটা পিছিয়ে যায়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছয়জন পুরুষকে নিয়ে করা একটি ছোট গবেষণাতেও কাছাকাছি ফল পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, আলু খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে পাকস্থলী থেকে খাবার খালি হওয়ার গতি এবং রক্তে গ্লুকোজের সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছানোর সময় বিলম্বিত হয়।
তবে এত অল্পসংখ্যক মানুষের ওপর গবেষণা থেকে প্রতিদিন খাবারের আগে অলিভ অয়েল পান করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে বা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। গ্লুকোজ মনিটরে খাবারের পরপর কম মাত্রা দেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বা অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের প্রভাব প্রকাশ করে না।
অলিভ অয়েলের ক্যালরিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে
অলিভ অয়েলে প্রতি গ্রামে প্রায় ৯ ক্যালরি থাকে। সরিষা, চিনাবাদামসহ অন্যান্য রান্নার তেলের মতোই এর ক্যালরির পরিমাণ। এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েলে প্রায় ১২০ ক্যালরি থাকে। দুই টেবিল চামচে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৪০ ক্যালরিতে। এক্সট্রা ভার্জিন বা এক্সট্রা লাইট—যে নামেই বিক্রি হোক, ক্যালরির পরিমাণে বড় কোনো পার্থক্য হয় না।
কেউ যদি প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত এক বা দুই চামচ তেল পান করেন, তাহলে তাঁর দৈনিক ক্যালরি গ্রহণও বেড়ে যাবে। এতে পরে ক্ষুধা কম লাগতে পারে এবং অন্য খাবার কম খাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এমনটা সবার ক্ষেত্রে ঘটবে, তা ধরে নেওয়া যায় না। তাই অলিভ অয়েল অন্য কোনো খাবার বা তেলের পরিবর্তে খাওয়া হচ্ছে, নাকি নিয়মিত খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীরে চর্বি জমতে পারে। বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে ও যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।
এর ফলে যকৃৎ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি গ্লুকোজ রক্তে ছাড়তে পারে এবং পেশি রক্ত থেকে গ্লুকোজ গ্রহণে কম কার্যকর হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফ্যাটি লিভার, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি ও কোমরের পরিধি বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও এর সঙ্গে দেখা দিতে পারে।
তাই একটি খাবারের পর রক্তে শর্করা তুলনামূলক কম বাড়লেও অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুষিয়ে যায় না। ওজন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও প্রোটিনের ভারসাম্য এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ।
অলিভ অয়েলের কোন ধরনের তেল বেশি উপকারী?
অলিভ অয়েলে প্রধানত থাকে ওলেইক অ্যাসিড, যা এক ধরনের মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড। মাখন বা ঘিয়ের মতো স্যাচুরেটেড ফ্যাটের কিছু অংশের পরিবর্তে এ ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত হতে পারে। অলিভ অয়েলের স্বাস্থ্যগত উপকারিতার বড় একটি কারণ এই ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন।
এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল যান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিষ্কাশন করা হয়, এতে পরিশোধনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয় না। ফলে এতে পলিফেনল নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান তুলনামূলক বেশি থাকে। ভার্জিন অলিভ অয়েলও পরিশোধন ছাড়াই তৈরি হয়, তবে এর গুণগত মানের কিছু মানদণ্ড আলাদা।
অন্যদিকে, পরিশোধিত অলিভ অয়েলে স্বাদ ও গন্ধ কমে যায় এবং পলিফেনলের বড় অংশ নষ্ট হয়। তবে এর মূল ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন অনেকটাই বজায় থাকে। বাজারে শুধু ‘অলিভ অয়েল’ নামে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলো সাধারণত পরিশোধিত ও ভার্জিন তেলের মিশ্রণ।
‘এক্সট্রা লাইট’ বলতে তেলের হালকা স্বাদ বা গন্ধ বোঝায়, কম ক্যালরি নয়। আর অলিভ পোমেস অয়েল তৈরি হয় তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্টাংশ থেকে। এটি পরিশোধনের মাধ্যমে ভোজ্য তেলে পরিণত করা হয়। এ ধরনের তেলে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের সমপরিমাণ পলিফেনল রয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
হৃদ্স্বাস্থ্যে অলিভ অয়েলের উপকারিতা কতটা?
স্পেনের প্রায় সাড়ে সাত হাজার বয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত বড় একটি গবেষণা ‘প্রেডিমেড’-এ ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এতে একদল অংশগ্রহণকারীকে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলসমৃদ্ধ ভূমধ্যসাগরীয় খাবার দেওয়া হয়। অন্য দলকে খাদ্যতালিকায় চর্বি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, অলিভ অয়েলসমৃদ্ধ ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীদের হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা হৃদ্রোগে মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি অন্য দলের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম ছিল।
তবে এই গবেষণা খাবারের আগে অলিভ অয়েল পান করার বাড়তি উপকারিতা প্রমাণ করে না। বরং এতে সমর্থন পাওয়া যায় এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলসহ সামগ্রিক ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসের। এ খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল ও বাদামও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু অলিভ অয়েলকেই এর সব উপকারের কারণ বলা যায় না। একইভাবে সব ধরনের অলিভ অয়েলের ক্ষেত্রেও এসব ফল প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
রান্নায় অলিভ অয়েল ব্যবহার করা কতটা নিরাপদ?
তাপের সংস্পর্শে অলিভ অয়েলের পলিফেনলের পরিমাণ কমতে পারে। বিশেষ করে বেশি তাপমাত্রায় বা দীর্ঘ সময় ধরে গরম করলে এ উপাদান বেশি নষ্ট হয়। একটি পরীক্ষায় প্যানে রান্নার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দেখা গেছে, ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মোট পলিফেনল প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ১৭০ ডিগ্রিতে প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। তবে এগুলো নির্দিষ্ট পরীক্ষার ফল; ঘরে রান্না করা প্রতিটি খাবারের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় পরিবর্তন হবে, এমন নয়।
তবে গরম করলেই অলিভ অয়েলের সব পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায় না। এতে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট তুলনামূলকভাবে অক্সিডেশনের বিরুদ্ধে স্থিতিশীল। তাই ভালো মানের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল দিয়ে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রান্না করা যায়। শুধু তেলের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা বেশি হলেই সেটি অক্সিডেশনের বিরুদ্ধে বেশি স্থিতিশীল—এমন নয়।
পরিশোধিত অলিভ অয়েল ও পরিশোধিত তেলের মিশ্রণের ধোঁয়া ওঠার তাপমাত্রা সাধারণত ভার্জিন তেলের চেয়ে বেশি। ফলে তুলনামূলক বেশি তাপে রান্নার ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করা যায়। তবে এসব তেলে শুরু থেকেই পলিফেনলের পরিমাণ কম থাকে। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল দিয়ে মাঝারি আঁচে সবজি রান্না করা, সালাদে ব্যবহার করা কিংবা রান্নার পর খাবারে মেশানো যেতে পারে।
ভারতীয় রান্নাঘরে অল্প সময়ের জন্য সবজি রান্না করা এবং একই তেল বারবার গরম করে ডুবোতেলে খাবার ভাজার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। খালি কড়াইয়ে তেল ধোঁয়া ওঠা পর্যন্ত গরম করা বা একই তেল বারবার ব্যবহার করলে এর গুণগত মান নষ্ট হয়। কোনো ধরনের অলিভ অয়েলই অতিরিক্ত তাপে বারবার গরম করার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয় না। অলিভ অয়েলে ভাজা খাবারেও তেল ও ক্যালরি থাকে।
ওজন কমানোর ওষুধের বিকল্প নয় অলিভ অয়েল
ইঁদুরের ওপর চালানো গবেষণায় অলিভ অয়েল গ্রহণের পর GLP-1 নামের হরমোন নিঃসরণ বাড়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে এ ফলের ভিত্তিতে খাবারের আগে অলিভ অয়েল পান করাকে GLP-1-ভিত্তিক ওষুধের বিকল্প ভাবা ঠিক হবে না।
সেমাগ্লুটাইড ও টিরজেপাটাইডের মতো ওষুধ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এসব ওষুধের কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্রোগের ঘটনা কমাতে এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিডনি রোগের অগ্রগতি ধীর করতে সেমাগ্লুটাইড ভূমিকা রাখতে পারে। GLP-1-ভিত্তিক ওষুধ নিয়ে গবেষণায় বিপাকজনিত যকৃতের রোগে প্রদাহ ও ক্ষতচিহ্ন কমার প্রমাণও পাওয়া গেছে।
ইঁদুরের ওপর গবেষণা হজমপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর ভিত্তিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত কোনো ওষুধের পরিবর্তে অলিভ অয়েল পান করার পরামর্শ দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, অলিভ অয়েল স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ওজন কমানো ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষম খাবার, মোট ক্যালরি গ্রহণের ভারসাম্য এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমই গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও নিতে হতে পারে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস