হাওরাঞ্চলের মাটির সোঁদা গন্ধ আর ভাটি বাংলার সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে সহজ কথায় সুরে সুরে বাঁধাই করেছিলেন কালজয়ী লোকসংগীতশিল্পী শাহ আবদুল করিম। আজ এই বাউল সম্রাটের বিদায়ের ১৭ বছর পূর্ণ হলো।
সহজ-সরল বাণীতে জীবনের গভীর দর্শন তুলে ধরার পাশাপাশি তাঁর গান সবসময় সোচ্চার থেকেছে অন্যায়, সামাজিক কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সুরের অস্ত্র দিয়েই তিনি আজীবন লড়ে গেছেন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে।
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’ কিংবা ‘কোন মেস্তরী নাও বানাইল’-এর মতো অসংখ্য তুমুল জনপ্রিয় ও কালজয়ী গানের রচয়িতা এবং সুরকার তিনি।
১৯১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে জন্ম নেওয়া এই সাধকের সুরসাধনা শুরু হয়েছিল শৈশবেই, অভাব-অনটনের চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। তাঁর এই সংগীতযাত্রায় মূল প্রেরণা হিসেবে পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী, যাকে তিনি পরম ভালোবাসায় ‘সরলা’ বলে ডাকতেন। ১৯৫৭ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উজানধল গ্রামেই স্থায়ীভাবে নিবাস গড়েছিলেন তিনি।
কালনী নদীর তীরে বেড়ে ওঠা এই সাধকের সুরভাঙ্কার শুরুতে ভাটি বাংলায় তুমুল আলোড়ন তুললেও মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে তা শহরের গণমানুষের হৃদয়ে ব্যাপকভাবে জায়গা করে নেয়। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনধারণের জন্য কৃষিকাজে যুক্ত থেকেও কখনো গান লেখা বা সুর সৃষ্টি থেকে পিছিয়ে আসেননি তিনি।
জীবনে ৫০০টিরও বেশি গান সৃষ্টি করা এই সুরসাধককে ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়। তবে কোটি মানুষের ভালোবাসাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সুরের জগতকে এতিম করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই মহান শিল্পী।
কবি ও লোকসংস্কৃতি গবেষক সরোজ মোস্তফার মতে, বর্তমান সমাজের অসাম্প্রদায়িকতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শাহ আবদুল করিমের চেতনার গান আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং অনন্তকাল তা মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবে।