ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়া এখন আর শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের বিষয় হয়ে নেই। সৌদি আরবের জন্য এটি ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক যুদ্ধকে নিজেদের সীমান্তের বাইরে রাখার সক্ষমতার সরাসরি পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক হুথি হামলাগুলো পরিস্থিতির এই পরিবর্তন স্পষ্ট করে তুলেছে। সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরান এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন ও সাময়িকভাবে জ্বালানি অবকাঠামোর কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনে যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পাশাপাশি দেশটির পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাতেও সংঘাত বাড়ছে। একই সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে হুথিরা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ফলে সৌদি আরবকে এখন একই সঙ্গে স্থলভাগের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা দুই দিক সামলাতে হচ্ছে।
সৌদির সামনে দ্বিমুখী ঝুঁকি
সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা দুটি। প্রথমত, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দ্বিতীয়ত, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও তা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব হলো লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এই রুটে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে বাণিজ্যিক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘপথে যেতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং পণ্য সরবরাহের সময় সবই বাড়তে পারে।
কেন সৌদি আরবের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত
রিয়াদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন হলো হুথিদের বিরুদ্ধে কতটা সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে এবং কোথায় গিয়ে সংযম ধরে রাখা হবে।
একদিকে, সৌদি ভূখণ্ডে ধারাবাহিক হামলা হলে তার জবাব না দিলে প্রতিপক্ষ আরও উৎসাহিত হতে পারে। অন্যদিকে, বড় ধরনের সামরিক অভিযান ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং সৌদি আরবকে আবারও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
সৌদি আরব গত কয়েক বছরে ইয়েমেন ইস্যুতে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেছে। তাই নতুন করে বড় সামরিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রিয়াদের জন্য সহজ নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক সংঘাত একই সময়ে চলতে থাকায় ইয়েমেনের যুদ্ধকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে গেছে। ইরান, হুথি, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সবগুলো বিষয় এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিও বড় ঝুঁকিতে
সৌদি আরবের অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
এই অবস্থায় সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো বা বন্দরকেন্দ্রিক স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়বে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকট বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে একটি স্থানীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
সংযমের পরীক্ষা
সৌদি আরব এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং অতিরিক্ত সংযম দুটোরই মূল্য দিতে হতে পারে। হুথিরা যদি সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে চাপ অব্যাহত রাখে, তাহলে রিয়াদের ধৈর্যের সীমাও একসময় প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আল-জাজিরার প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের নতুন করে উত্তেজনা সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধকে সীমান্তের বাইরে রাখার সক্ষমতারও পরীক্ষা নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া, যা ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত করে।
কারণ হুথিদের সঙ্গে সংঘাত এখন শুধু ইয়েমেনের মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়ছে সৌদি সীমান্ত, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে। ফলে এই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, সৌদি আরবের জন্য ততই কঠিন হয়ে উঠবে সামরিক প্রতিক্রিয়া, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
হোয়াটসঅ্যাপ-মোবাইলে গোপন কথা বলতে নিষেধ সাবেক ধর্ম উপদেষ্টার
হরমুজে ট্যাংকার চলাচলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সুবিধার সময়সীমা কমলো
ইরান যুদ্ধে নতুন বিপদের আশঙ্কা
'আল্লাহ শক্তিতে মহান, শাস্তি প্রদানে আরও শক্তিশালী'