পাসপোর্ট অফিসের দালাল আর লম্বা লাইনের কথা চিন্তা করলেই কি আপনার জ্বর চলে আসে? বিশ্বাস করুন, সেই দিন এখন আর নেই। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট করার সিস্টেমটাকে এতটাই সহজ করেছে যে, আপনি চাইলেই ঘরে বসে আপনার স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে আবেদন করে ফেলতে পারবেন।
এমআরপি (MRP) পাসপোর্টের দিন শেষ। এখন যুগ স্মার্ট পাসপোর্টের। ই-পাসপোর্টে একটি ক্ষুদ্র চিপ থাকে যেখানে আপনার চোখের আইরিশ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং সব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকে। এয়ারপোর্টে ই-গেট ব্যবহার করে আপনি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হতে পারবেন, লাইনে দাঁড়ানোর কোনো ঝামেলা নেই!
ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য কী কী লাগবে
অনলাইনে E-Passport Apply করতে বসার আগে নিচের কাগজগুলো হাতের কাছে গুছিয়ে নিন, যাতে মাঝপথে আবার উঠতে না হয়:
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ: আপনার বয়স ১৮ এর বেশি হলে এনআইডি মাস্ট লাগবেই। আর ১৮ এর কম হলে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি লাগবে।
২. পুরনো পাসপোর্ট (যদি থাকে): আগে কোনো পাসপোর্ট করা থাকলে তার তথ্য দিতে হবে।
৩. নাগরিক সনদ ও পেশার প্রমাণপত্র: স্টুডেন্ট হলে আইডি কার্ড, চাকরিজীবী হলে অফিস আইডি বা এনওসি (NOC) লাগবে।
৪. বাবা-মায়ের এনআইডি কপি: ফরম পূরণের সময় তথ্যের মিল রাখার জন্য এটি দরকার।
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
কোনো দোকানে গিয়ে ২০০-৩০০ টাকা খরচ করার দরকার নেই। নিজের কাজ নিজেই করুন। প্রথমে চলে যান ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (epassport.gov.bd)
সেখানে ‘Apply Online’ এ ক্লিক করুন।
প্রথমে আপনার জেলা এবং থানার নাম সিলেক্ট করুন।
এরপর আপনার ইমেইল দিয়ে একটি একাউন্ট খুলে ফেলুন।
ধাপে ধাপে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম) একদম এনআইডি কার্ড দেখে দেখে পূরণ করবেন। মনে রাখবেন, এখানে একটি বানানের ভুল মানেই পরবর্তীতে বিশাল ভোগান্তি।
ফর্ম পূরণের সময় ‘Delivery Type’ এর জায়গায় রেগুলার (Regular) না এক্সপ্রেস (Express) ডেলিভারি নেবেন, তা ভেবেচিন্তে সিলেক্ট করবেন। কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই আপনার পাসপোর্টের ফি নির্ধারণ হবে।
ই-পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে
অনেকেই এই জায়গাটিতে এসে কনফিউজড হয়ে যান। ২০২৬ সালের বর্তমান আপডেট অনুযায়ী ৪৮ পাতা এবং ৬৪ পাতার পাসপোর্টের ফি ভিননো। সঙ্গে যোগ হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। তাও একটি সহজ হিসাব দিচ্ছি:
৪৮ পাতার পাসপোর্ট (মেয়াদ ৫ বছর):
রেগুলার ডেলিভারি (১৫-২১ দিন): ৪,০২৫ টাকা
এক্সপ্রেস ডেলিভারি (৭-১০ দিন): ৬,৩২৫ টাকা
সুপার এক্সপ্রেস (২ দিন): ৮,৬২৫ টাকা
৪৮ পাতার পাসপোর্ট (মেয়াদ ১০ বছর):
রেগুলার ডেলিভারি: ৫,৭৫০ টাকা
এক্সপ্রেস ডেলিভারি: ৮,০৫০ টাকা
সুপার এক্সপ্রেস: ১০,৩৫০ টাকা
ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার সময় অবশ্যই আপনার অ্যাপ্লিকেশনের রেফারেন্স নম্বরটি সঠিকভাবে লিখবেন, নাহলে পেমেন্ট ভেরিফাই হবে না।
বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট ও ছবি তোলা
অনলাইনে আবেদন সাবমিট করার পর একটি পিডিএফ ফাইল পাবেন। সেটা প্রিন্ট করে সঙ্গে এনআইডি কার্ডের কপি, ব্যাংক ড্রাফট বা চালানের কপি এবং আগের কোনো পাসপোর্ট থাকলে সেটা নিয়ে আপনার নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে চলে যাবেন।
সেখানে আপনার ১০ আঙ্গুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং ছবি তোলা হবে। মনে রাখবেন, পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার দিন সাদা বা খুব হালকা রঙের জামা না পরাই ভালো, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা থাকে। গাঢ় রঙের পোশাকে ছবি ভালো আসে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে ভয়?
এখন অনেকেই ভাবছেন পুলিশ ভেরিফিকেশন মানেই তো এক গাড়ি টাকা খরচ। না ভাই, বিশ্বাস করেন, আপনার যদি সব কাগজপত্র ঠিক থাকে এবং আপনার নামে কোনো মামলা না থাকে, তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন এখন অনেক সহজ। পুলিশ অফিসার আপনার বাসায় এসে তথ্য যাচাই করবেন। সততার সঙ্গে তথ্য দিলে কোনো হয়রানি হওয়ার কথা না। তবে হ্যাঁ, মিষ্টি খাওয়ার কালচারটা তো আমাদের দেশে আছেই, সেটা পরিস্থিতি বুঝে হ্যান্ডেল করবেন!
অবশ্যই আপনার এনআইডি এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে যেন আবেদনের তথ্যের ১০০ শতাংশ মিল থাকে। এক চুল এদিক ওদিক হলে পাসপোর্ট আটকে যাবে। একই সঙ্গে এনআইডি কার্ডে বা ফর্মে যে স্বাক্ষর দিয়েছেন, বায়োমেট্রিক দেওয়ার সময় প্যাডে ঠিক একই স্বাক্ষর দেবেন। আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডেটে সকাল সকাল পাসপোর্ট অফিসে চলে যাবেন। দুপুরের পর ভিড় বাড়ে এবং সার্ভার স্লো হতে পারে।