ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিলেও দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে শক্তিশালী করতে তারা ঘোষণা করেছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা ‘Shadow Cabinet’ গঠনের। মূলত সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাবের লক্ষ্যেই এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?
ছায়া মন্ত্রিসভা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বিশেষ কাঠামো, যেখানে প্রধান বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে তাদের নিজস্ব একজন বিশেষজ্ঞ বা মুখপাত্র নিয়োগ করে। সহজ কথায়, সরকারের একজন ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ থাকলে বিরোধী দলেরও একজন ‘ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ থাকবেন। এই ছায়া মন্ত্রীরা বাস্তবে কোনো দাপ্তরিক ক্ষমতা বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন না। তবে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কাজের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখেন, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেন এবং প্রয়োজনে বিকল্প জাতীয় নীতি প্রস্তাব করেন।
কেন এই উদ্যোগ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত জোটের এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব পূরণে সাহায্য করবে।
এর প্রধান ভূমিকাগুলো হলো:
- জবাবদিহিতা: সরকারি মন্ত্রীরা যখন সংসদে কোনো বিল বা নীতি আনবেন, ছায়া মন্ত্রীরা সেই বিষয়ের কারিগরি ও রাজনৈতিক ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরবেন।
- বিকল্প নেতৃত্ব: এর মাধ্যমে বিরোধী দল প্রমাণ করে যে, তারা যেকোনো সময় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। এটি এক ধরনের ‘সরকার গঠনের মহড়া’।
- অধিকার রক্ষা: সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী হলে ছায়া মন্ত্রিসভা তাৎক্ষণিক বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে জনমত গঠন করতে পারে।
- বিশেষজ্ঞ মতামত: ছায়া মন্ত্রীরা সাধারণত নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হন, ফলে সংসদে আলোচনা অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ ও গঠনমূলক হয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেম
ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণাটি মূলত ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থা বা ‘ওয়েস্টমিনিস্টার সিস্টেম’ থেকে এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এই চর্চা অত্যন্ত শক্তিশালী:
যুক্তরাজ্য: ব্রিটেনে এটি সবচেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। সেখানে বিরোধী দলীয় নেতাকে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া: এই দুই দেশেও ব্রিটিশ আদলে অত্যন্ত সক্রিয় ছায়া মন্ত্রিসভা রয়েছে যারা সরকারকে নিয়মিত চাপে রাখে।
ভারত: পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে বেতনভুক্ত ছায়া মন্ত্রিসভা না থাকলেও প্রধান বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট মুখপাত্র নিয়োগের মাধ্যমে এই চর্চা বজায় রাখে।
অন্যান্য দেশ: নিউজিল্যান্ড এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিরোধী দল ‘ডেমোক্রটিক অ্যালায়েন্স’ নিয়মিত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব
বাংলাদেশে অতীতে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা খুব একটা দেখা যায়নি। জামায়াত জোটের এই ঘোষণার ফলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও যুক্তিনির্ভর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিএনপি যখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন জামায়াত জোটের এই ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠন বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।