বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা

‘জুলাই সনদ’ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় দেশবাসীকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া তার বিদায়ী ভাষণে তিনি এই শুভেচ্ছা জানান।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘একটি প্রশংসনীয় নির্বাচনের নজির সৃষ্টিতে জনগণ, রাজনৈতিক দল, ভোটার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে সম্মিলিত ভূমিকা রেখেছে, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’

ভাষণে তিনি ‘জুলাই সনদ’কে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘গণভোটে দেশের মানুষ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে দেশে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমি আশা করি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এটি বাস্তবায়িত হবে।’

বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক কাজের কথা হয়তো মানুষ ভুলে যাবে, কিন্তু ‘জুলাই সনদ’ জাতি কখনো ভুলবে না। এই সনদ রচনা এবং গণভোটে তা পাস করার পেছনে যেসব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে, আমি তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানাই।’

নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল-তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ বিদায়ের দিনে ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে আপনাদের কিছু কথা বলব। কী মহা মুক্তির দিন ছিল সেদিনটি! সে কী আনন্দের দিন! বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে যে যেখানে ছিল আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ সম্পূর্ণ অচল। অচল এই দেশটিকে কীভাবে সচল করা যাবে সেটা ছিল সবার মনে।

‘অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা ঠিক করল দেশকে সচল করার জন্য একটি সরকার লাগবে। সরকার গঠন ও চালাবার জন্য তারা আমাকে খবর দিলো। আমি তখন বিদেশে। আমি দায়িত্ব নিতে রাজি না। তারা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বলে আমাকে রাজি করালো। ১৮ মাস পর এখন আমার যাওয়ার পালা।’

তিনি বলেন, ‘আমি আজ আমার কাজ হতে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি। আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাতো। তাদের একান্ত অনুগত লোক নিয়ে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়েছে। বড় কর্তা পালিয়েছে। মাঝারি কর্তা পালিয়েছে। অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে। অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে।’

‘কেউ নানাজনের সুপারিশ নিয়ে আসছে তারা অভ্যুত্থানের গোপন সৈনিক ইত্যাদি। সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেন না- এটি মহাসংকট হয়ে দাঁড়াল। যতই মৃতদেহের, অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন দেহের সন্ধান আসছিল ততই তারা চিহ্নিত হচ্ছিল। সেই থেকে ১৮ মাস চলে গেছে। অবশেষে ১২ই ফেব্রুয়ারি আসলো।, 

তিনি আরও বলেন, দেড় যুগ পর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন এবং ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান হলো। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ, দেশের সর্বত্র একটা ঈদের পরিবেশ ছিল যা আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। দেড় বছর পর গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনের পর নতুন সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকাল। আগামীকাল মঙ্গলবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ। ভাষণে তিনি নতুন সরকারের সাফল্য কামনা করেন এবং একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।