আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি পরম আনুগত্য ও আত্মত্যাগের এক অনন্য নিদর্শনে মহিমান্বিত মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
বাঙালি সমাজে এই উৎসবটি ‘কোরবানির ঈদ’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। প্রতি বছর হিজরি বর্ষপঞ্জির জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই দিনটি উদযাপিত হয়।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সবখানেই আজ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা, গভীর আবেগ ও বিপুল উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করা হচ্ছে।
মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় ঈদের জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করছেন।
সাম্য ও সম্প্রীতির ঈদের জামাত
সুদীর্ঘকাল ধরে এই পবিত্র উৎসব মুসলিম উম্মাহর মাঝে ত্যাগের মহান আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে। আজ ঈদের দিন সকালে চারপাশের ঈদগাহ ময়দান ও মসজিদগুলোতে ঢল নামে মুসল্লিদের। সেখানে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ের জন্য সমবেত হন সবাই।
ধনী-দরিদ্রের সব সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে এদিন মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন এবং একে অপরের সঙ্গে ঈদের কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। নামাজ শেষে খতিব সাহেবরা খুতবার মাধ্যমে উপস্থিত সবার সামনে কোরবানির মূল শিক্ষা ও তাৎপর্য তুলে ধরেন।
কোরবানির মূল শিক্ষা ও ঐতিহাসিক পটভূমি
ঈদের নামাজ সম্পন্ন হওয়ার পরপরই শুরু হয় কোরবানির মূল আনুষ্ঠানিকতা। সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজ নিজ পশু কোরবানি করছেন।
নিজের জান-মাল এবং সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য আনন্দের সঙ্গে বিলিয়ে দেওয়ার যে মহান শিক্ষা, তা-ই প্রতি বছর ঘুরেফিরে এই ঈদুল আজহার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হয়।
ঐতিহাসিকভাবে পবিত্র ঈদুল আজহার এই বিধান হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইলের (আ.) এক অবিস্মরণীয় ত্যাগের ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্রকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছিলেন।
মূলত এটি ছিল হযরত ইব্রাহিমের (আ.) প্রতি সৃষ্টিকর্তার এক কঠিন পরীক্ষা। তিনি কোনো দ্বিধা না রেখে পুত্রকে জবেহ করার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে সেই পরীক্ষায় পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হন।
ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী, নিজের চোখ বেঁধে যখন তিনি পুত্রের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন, তখন কোরবানি সম্পন্ন হওয়ার পর চোখ খুলে দেখতে পান যে, আল্লাহর অলৌকিক কুদরতে হযরত ইসমাইলের (আ.) কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং তাঁর পরিবর্তে সেখানে জান্নাত থেকে পাঠানো একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে গেছে।
হযরত ইব্রাহিমের (আ.) সেই ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব ত্যাগের স্মৃতিকে চিরভাস্বর করে রাখতেই ইসলামি শরিয়তে কোরবানিকে ওয়াজিব বা আবশ্যক করা হয়েছে।
জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত ও বিশিষ্টজনদের শুভেচ্ছা
পবিত্র এই আনন্দলগ্নে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও জনগণের প্রতি ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছেন।
রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। এই প্রধান জামাতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতাসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নেন। ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় বিশেষ ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশজুড়ে ঈদের আমেজ ও বিশেষ আয়োজন
ঈদুল আজহার এই আনন্দ উৎসবে দেশজুড়ে বিশেষ সরকারি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সমস্ত সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোকে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ঈদকে কেন্দ্র করে নানা মাত্রিক ও বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।
এছাড়া ঈদের দিনটিতে বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি এতিমখানা ও শিশু সদনগুলোতে অবস্থানকারীদের জন্য উন্নত ও বিশেষ মানের খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে, এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের মানুষ মেতে উঠেছে এক দীর্ঘ ছুটির আমেজে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গত ২৫ মে থেকেই এই ছুটির সূচনা হয়েছে, যা আগামী ৩১ মে পর্যন্ত বহাল থাকবে।
ঈদের মূল ছুটির পাশাপাশি সরকারের নির্বাহী আদেশে অতিরিক্ত ছুটি যুক্ত হওয়ার কারণেই এবার দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই দীর্ঘ ছুটির সুযোগ উপভোগ করছেন।