সংসদ সদস্যদের কেউ ঋণখেলাপি নন, কেউ কেউ হয়তো ঋণগ্রস্ত হতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংসদ অধিবেশনে ‘ঋণখেলাপি’ নিয়ে সংসদ সদস্যদের বাদানুবাদের মধ্যে এ মন্তব্য করেন তিনি।
জাতীয় সংসদে ‘ঋণখেলাপি’ শব্দটির ব্যবহার ও এর আইনি বৈধতা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে এক তীব্র বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়েছে। চলমান সংসদ অধিবেশনে এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে, যা পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা এবং ডেপুটি স্পিকারের হস্তক্ষেপে এক ভিন্ন মাত্রা পায়। আইন প্রণেতাদের এই বাহাসকে কেন্দ্র করে সংসদ কক্ষের ভেতরে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
আলোচনার শুরুতেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন। তিনি এই সংসদকে দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের ফসল হিসেবে উল্লেখ করে একে একটি ব্যতিক্রমী ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ বলে দাবি করেন। তবে ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে কিছু সংসদ সদস্য সচেতন বা অসচেতনভাবে এমন কিছু মন্তব্য করছেন, যা পুরো সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে এবং একে বিতর্কিত করে তুলছে।
কোনো এক সংসদ সদস্যের করা মন্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লোকজ প্রবাদের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘ভেড়া যদি খেত খায়, সেই খেত টেকানো যায় না।’ নিজেদের মান-সম্মান ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি অতি উৎসাহী হয়ে আত্মঘাতী বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান এবং ডেপুটি স্পিকারের কাছে এই সংক্রান্ত আগের সমস্ত বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ বা প্রত্যাহারের দাবি তোলেন।
ফজলুল হক মিলনের এই বক্তব্যের পর পরই এর তীব্র বিরোধিতা করে দাঁড়িয়ে যান বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বেশ কড়া সুরে বলেন, নির্বাচনের আগে থেকেই তারা ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে রাজপথে ও গণমাধ্যমে কথা বলে আসছেন এবং দলগুলো যে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়েছে, তা স্পষ্ট। এমনকি চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সংখ্যা উল্লেখ করে সংসদে বক্তব্য দিয়েছিলেন, যদিও তৎকালীন সময়ে কারও সম্মানহানি না করার উদ্দেশ্যে নাম প্রকাশ করেননি।
তিনি যুক্তি দেখান, যদি কোনো দল ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিয়ে সংসদে নিয়ে আসে, তবে সেই দায় সম্পূর্ণ ওই দলের। সংসদে যদি বিপুল সংখ্যক এমন ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন, তবে সাধারণ মানুষ একে ঋণখেলাপিদের সংসদ বলতেই পারে। সার্বভৌম সংসদে দাঁড়িয়ে যদি সত্য কথা ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরা না যায়, তবে আর কোথায় বলা যাবে,এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সাথে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ঋণখেলাপি বলাটা কোনোভাবেই এক্সপাঞ্জ করার মতো বক্তব্য নয়।
দুই পক্ষের এই যুক্তিতর্ক ও বাদানুবাদের প্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আইনি ব্যাখ্যা দিতে ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি পুরো বিষয়টির একটি আইনি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই সংসদের কোনো সদস্যই ঋণখেলাপি নন। দেশের প্রচলিত নির্বাচনী আইন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এবং অন্যান্য বিধিমালা অত্যন্ত কঠোর।
আইন অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক কেউ ঋণখেলাপি সাব্যস্ত হলে তিনি কোনোভাবেই সংসদ সদস্য পদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন না এবং নির্বাচন কমিশনও তা গ্রহণ করে না। যেহেতু তারা সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া পার হয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এই পবিত্র সংসদে এসেছেন, সেহেতু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের ঋণখেলাপি বলার কোনো সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও ব্যাখ্যা করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে অনেকেই বড় অঙ্কের ঋণ নিতে পারেন এবং সেই সূত্রে কেউ কেউ হয়তো ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, কিন্তু ঋণগ্রস্ত হওয়া আর ঋণখেলাপি হওয়া এক বিষয় নয়। অতীতে কারও কারও বিরুদ্ধে ব্যাংকের মামলা থাকলেও নির্বাচনের আগেই উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে সেগুলোর আইনি নিষ্পত্তি ঘটেছে এবং আদালত তাদের বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। আইনিভাবে বৈধতা পাওয়ার পর তাদের পুনরায় এই অভিযোগে অভিযুক্ত করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সংসদকে ‘ঋণখেলাপিদের সংসদ’ বলাকে তিনি মানহানিকর বক্তব্য হিসেবে অভিহিত করেন এবং এটি অবশ্যই সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া উচিত বলে মত দেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর সভাপতিমণ্ডলীর আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল আইন প্রণেতাদের আশ্বস্ত করেন। তিনি জানান, সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন যে পয়েন্টটি উত্থাপন করেছেন এবং যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সংসদ সচিবালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখবে। পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করার পর যদি দেখা যায় যে বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করার যোগ্য, তবে বিধি অনুযায়ী তা অবশ্যই সংসদীয় রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই আশ্বাসের পর সংসদের মধ্যকার উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে।