জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে অবশেষে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) রাতে সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ১৭ সদস্যের এই কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তবে বিরোধীদল 'সংবিধান সংশোধন পরিষদ' গঠনের দাবিতে অনড় থেকে এই কমিটিতে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সংসদ কক্ষ ত্যাগ করে।
বিরোধীদলের এই তীব্র আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত ১২ জন সদস্য নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠিত হয়। অবশ্য সরকারি দল জানিয়েছে, বিরোধীদল পরবর্তীতে চাইলে তাদের পছন্দের সদস্যদের নাম দিয়ে এই কমিটিতে যুক্ত হতে পারবে। নবগঠিত এই বিশেষ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে।
কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং জয়নাল আবেদিন। এছাড়া মোহাম্মদ জুনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিভ রহমান পার্থ, মোহাম্মদ নুরুল হক এবং মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। নারী সদস্য হিসেবে আছেন ফারজানা শারমিন ও সাকিলা ফারজানা, এবং বাকি দুই সদস্য হলেন মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল ও মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।
কমিটি গঠনের প্রস্তাবের পরপরই ফ্লোর নিয়ে কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট জানান, প্রথম অধিবেশনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এই প্রস্তাব এনেছিলেন, সেদিনই বিরোধীদল তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছিল। এর মাঝে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েক দফা বৈঠক করা হলেও নীতিগত কারণে বিরোধীদল কোনো সদস্যের নাম দেয়নি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে দেশের সব দলই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় এলে তা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই গণভোটে দেশের প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। এই বিপুল জনমতকে অবজ্ঞা করা হলে দেশের মানুষ ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি আলাদা শপথ নিয়েছেন। জনগণের এই রায় ও নিজেদের নেওয়া শপথের প্রতি সম্মান জানিয়েই তারা এই বিশেষ কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবেই তারা সংসদ থেকে ওয়াক আউট করার সিদ্ধান্ত নেন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের প্রধান প্রত্যাশাই হলো বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। এটি বাতিল না করলে উচ্চ আদালতের রায়ের পরও দেশকে ওই পুরনো ও বিতর্কিত ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে। তাই নতুন প্রত্যশায় দেশকে এগিয়ে নিতে এই কমিটি গঠন করা বাধ্যতামূলক ছিল।
বিরোধীদলের দুটি শপথের দাবিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও 'নাল অ্যান্ড ভয়েড' (বাতিল) বলে আখ্যা দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ীই যখন সংসদ ও নির্বাচন পরিচালিত হচ্ছে, তখন আলাদা শপথের বৈধতা কোথায়? তিনি জানান, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তফসিল লঙ্ঘন করে ব্লু পেপারে ছাপানো ওই শপথের কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
গণভোটের আদেশটিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ' হিসেবে উল্লেখ করে একে এখতিয়ারবহির্ভূত ও সংবিধানের ওপর প্রতারণা বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদের কোথাও এমন কোনো শর্ত ছিল না যেখানে উভয় পক্ষ স্বাক্ষর করেছে। তারা সনদের বেশিরভাগ অংশ মানলেও একটি অংশ সংবিধানের ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ করতে চাইছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলকে আবেগসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে সংসদে এসে আলোচনা করার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাস্তায় গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করলে আদতে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হবে না। আর তা না হলে জাতিকে শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই চলতে হবে, যা দেশের মানুষ কখনোই চায় না।
অবিলম্বে এই বিশেষ কমিটি তাদের কার্যক্রম শুরু করবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের সাথে আলোচনা করবেন। একই সাথে জুডিশিয়ারি, সুপ্রিম কোর্ট বার, গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর সাথেও বিস্তারিত পরামর্শ করা হবে। সবার সুপারিশের ভিত্তিতেই সংসদে চূড়ান্তভাবে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।
তথ্যের উৎস (Source): জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংসদীয় অধিবেশন কার্যবিবরণী (১৩ জুলাই, ২০২৬)।