বিরোধী দলের ওয়াকআউট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া জবাব

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১৭ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ আপাতত শূন্য রাখা হয়েছে, কারণ তারা কোনো সদস্যের নাম প্রস্তাব করেনি।

কমিটি গঠনের প্রতিবাদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। এ সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদকে উপেক্ষা করে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠনের বিরোধিতা করে বিরোধী দল তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। অন্যদিকে সরকার বলেছে, সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ক্ষমতা একমাত্র জাতীয় সংসদের, তাই প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন ছাড়া বিকল্প নেই।

সোমবার (১৩ জুলাই)  রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ নেতা পক্ষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে আপাতত ১২ জন সদস্য রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষিত পাঁচটি পদ পরে তাদের পক্ষ থেকে নাম প্রস্তাব করা হলে পূরণ করা হবে বলে জানানো হয়।

এর আগে গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সংসদে ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। সে সময় সরকারি দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্য থেকে ১২ জন এবং বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তখন বিরোধীদলীয় নেতা বিষয়টি পরে জানানো হবে বলে সংসদকে অবহিত করলেও পরে সাংবাদিকদের কাছে স্পষ্ট করেন যে, নীতিগত কারণে তাদের দল এই কমিটিতে কোনো সদস্য দেবে না। সেই অবস্থান থেকেই সোমবার কমিটি গঠনের দিনও তারা অংশ নেয়নি।

ওয়াকআউটের আগে সংসদে বক্তব্য দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রথম অধিবেশনেই উত্থাপিত হয়েছিল এবং তখনই বিরোধী দল তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছিল। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ ও বৈঠক হলেও তারা কখনোই এই কমিটিতে সদস্য দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দেয়নি।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে সেই রায় বাস্তবায়ন করা হবে। বিরোধী দলের দাবি, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে যেমন শপথ নিয়েছেন, তেমনি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। ফলে সেই পরিষদকে পাশ কাটিয়ে নতুন সংসদীয় কমিটি গঠন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থিত গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারাতে পারে। জনগণের সেই রায়ের প্রতি সম্মান জানাতেই তারা শুধু কমিটিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন না, বরং সংসদ থেকেও ওয়াকআউট করছেন।

তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পর রাত ৯টা ২৩ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্পিকারের অনুমতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা হলো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা। কিন্তু জাতীয় সংসদ সংবিধান সংশোধন না করলে আদালতের কোনো রায় হলেও রাষ্ট্রকে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। তাই সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন অপরিহার্য।

বিরোধীদলীয় নেতার ‘দুটি শপথ’-এর প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সংসদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই সংবিধানের বাইরে আরেকটি শপথের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।

তিনি দাবি করেন, সংবিধানে কোথাও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথক শপথ নেওয়ার বিধান নেই। সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তফসিলের বাইরে যে অতিরিক্ত শপথের ফরম তৈরি করা হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, বাতিল এবং আইনগতভাবে অকার্যকর।

গণভোট-পরবর্তী ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতির এমন আদেশ জারির সাংবিধানিক এখতিয়ার ছিল না এবং সেটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার যে জুলাই সনদ হয়েছে, তার অধিকাংশ বিষয়ে সরকার একমত হলেও সংবিধানের ওপর কর্তৃত্ব আরোপের প্রচেষ্টা তারা গ্রহণযোগ্য মনে করে না।

সংবিধানের ৬৫ ও ৭ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণ তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে জাতীয় সংসদকে দিয়েছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের দায়িত্ব সংসদেরই এবং সে দায়িত্ব পালনে সরকার পিছিয়ে থাকবে না।

তিনি জানান, নবগঠিত বিশেষ কমিটি অবিলম্বে কাজ শুরু করবে। বিচার বিভাগ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ সংগ্রহ করা হবে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।

বিরোধী দলকে সংসদে ফিরে এসে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আবেগনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী প্রণয়নে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা প্রয়োজন।

Attr
আরও পড়ুন