সেপ্টেম্বরে ৪৪২ সড়ক দুর্ঘটনা, নিহত ৪২৩

দেশে সেপ্টেম্বর মাসে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু রয়েছেন। এ সময়ে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (৪ অক্টোবর) সংগঠনটি প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে সড়কে হাঁটতে গিয়ে বা পথচারী হিসেবে নিহত হয়েছেন ১০৬ জন। এ ছাড়া যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন।

কোন যানবাহনে কত প্রাণহানি

যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাসের যাত্রী ২৬ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-ট্রলি আরোহী ১৯ জন, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের আরোহী ২১ জন এবং থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, অটোভ্যান, ইজিবাইক, সিএনজি ও লেগুনার যাত্রী ৮৮ জন নিহত হয়েছেন।

স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র ও টমটমের যাত্রী নিহত হয়েছেন ১৮ জন। এ ছাড়া প্যাডেলচালিত সাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন ৬ জন।

আঞ্চলিক সড়কেই বেশি দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৭৮টি বা ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে ১৪৫টি বা ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৬৮টি বা ৩৮ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৯টি বা ২৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ দুর্ঘটনায় পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি, যা মোট দুর্ঘটনার ২২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া পেছন থেকে আঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৬১টি এবং অন্যান্য কারণে ঘটেছে ৬টি দুর্ঘটনা।

সকালে বেশি দুর্ঘটনা

সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনার ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ ঘটেছে সকালে। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকায় ৫২ দুর্ঘটনায় নিহত ২১

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে সিলেট বিভাগে, যেখানে নিহত হয়েছেন ২১ জন।

একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন।

রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বর মাসে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ৪৭ জন আহত হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঘটেছে। রাজশাহীতে দুর্ঘটনা ১২ দশমিক ২১ শতাংশ ও প্রাণহানি ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে দুর্ঘটনা ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, খুলনায় দুর্ঘটনা ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ ও প্রাণহানি ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ, বরিশালে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ২০ শতাংশ ও প্রাণহানি ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, সিলেটে দুর্ঘটনা ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ ও প্রাণহানি ৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, রংপুরে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ ও প্রাণহানি ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে দুর্ঘটনা ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ও প্রাণহানি ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ।

নিহতদের মধ্যে ৫৮ জন শিক্ষার্থী

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ২৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৫ জন, এনজিও কর্মী ১৮ জন, দিনমজুর ১৪ জন এবং শিক্ষক ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় প্রতিনিধি ২১ জন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমার কর্মকর্তা ও কর্মচারী ১১ জন, পোশাকশ্রমিক ৬ জন, প্রকৌশলী ৪ জন, মোটর মেকানিক ৪ জন, সাংবাদিক ৩ জন, মসজিদের ইমাম বা খাদেম ৩ জন, পুলিশ সদস্য ২ জন, চিকিৎসক ২ জন, সেনাসদস্য ১ জন, কাস্টমস কর্মকর্তা ১ জন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১ জন এবং একজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন।

নৌ ও রেল দুর্ঘটনাতেও প্রাণহানি

সেপ্টেম্বর মাসে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, ৭ জন আহত এবং ৪ জন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৬ জন।

বেপরোয়া গতি বড় কারণ

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ঘটছে। এ গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সংগঠনটির মতে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টার অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে দায়ী করেছে।

সংগঠনটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার, মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার এবং রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালুর সুপারিশ করেছে।

এ ছাড়া দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো, চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনেরও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।