কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যাংকে জমা অর্থ কিংবা অন্যান্য সম্পত্তির মালিকানা কারা পাবেন এবং কে কতটুকু পাবেন—এ নিয়ে অনেক পরিবারে প্রশ্ন ও বিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ছেলে-মেয়ে, স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা কিংবা ভাইবোন থাকলে সম্পত্তির ভাগ কীভাবে নির্ধারণ হবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম সবার জন্য এক নয়। মৃত ব্যক্তির ধর্ম, জীবিত উত্তরাধিকারীদের পরিচয়, সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়। তাই শুধু ওয়ারিশ সনদ হাতে থাকলেই সম্পত্তির চূড়ান্ত ভাগ নির্ধারিত হয়ে যায় না।
ধর্ম ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয় উত্তরাধিকার
বাংলাদেশে মুসলিমদের উত্তরাধিকার সাধারণত মুসলিম ব্যক্তিগত আইন বা শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এ ক্ষেত্রে ফরায়েজের নিয়মে নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারীদের অংশ হিসাব করা হয়। হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিধান ভিন্ন হতে পারে।
১৯২৫ সালের Succession Act বা উত্তরাধিকার আইনেও সম্পত্তির উত্তরাধিকার, উইল, প্রোবেট ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিধান রয়েছে। তবে আইনটির সব বিধান সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। আইনটির ২৯ ধারায় নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে অন্তঃস্বত্ব উত্তরাধিকারের সাধারণ বিধান প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ রয়েছে।
তাই সম্পত্তি বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির ধর্ম এবং তাঁর ক্ষেত্রে কোন উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
মুসলিম উত্তরাধিকারে কে কত অংশ পান?
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কারা সম্পত্তির অংশ পাবেন, তা নির্ভর করে মৃত্যুর সময় কোন কোন উত্তরাধিকারী জীবিত ছিলেন তার ওপর। একই ব্যক্তি এক পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট অংশ পেতে পারেন, আবার অন্য উত্তরাধিকারী উপস্থিত থাকলে তাঁর অংশ পরিবর্তিত হতে পারে।
কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ:
স্বামী: মৃত স্ত্রীর সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে স্বামী সাধারণত এক-চতুর্থাংশ পান; সন্তান বা পুত্রের সন্তান না থাকলে পান অর্ধেক।
স্ত্রী: মৃত স্বামীর সন্তান বা পুত্রের সন্তান থাকলে স্ত্রী সাধারণত এক-অষ্টমাংশ পান; তা না থাকলে পান এক-চতুর্থাংশ। একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রযোজ্য অংশটি তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়।
কন্যা: কোনো পুত্র না থাকলে একজন কন্যার নির্দিষ্ট অংশ সাধারণত অর্ধেক; দুই বা ততোধিক কন্যা এবং পুত্র না থাকলে তাঁদের সম্মিলিত নির্দিষ্ট অংশ সাধারণত দুই-তৃতীয়াংশ। পুত্র থাকলে সাধারণত পুত্র ও কন্যা অবশিষ্ট সম্পত্তি ২:১ অনুপাতে পান।
বাবা-মা: তাঁদের অংশও মৃত ব্যক্তির সন্তান, অন্য উত্তরাধিকারী এবং পারিবারিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
এসব উদাহরণ সাধারণ নিয়ম বোঝানোর জন্য। সব উত্তরাধিকারীর পূর্ণ তালিকা ও প্রযোজ্য বিধান যাচাই না করে শুধু এ তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হিসাব করা উচিত নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য উত্তরাধিকারীর উপস্থিতির কারণে কারও অংশ কমতে পারে বা কেউ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিতও হতে পারেন।
মুসলিম উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি উত্তরাধিকারবিষয়ক পোর্টাল ‘উত্তরাধিকার—সহজেই সম্পত্তির হিসাব’-এ বিভিন্ন উত্তরাধিকারীর অংশ ও উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
সম্পত্তি ভাগের আগে কোন বিষয়গুলো দেখতে হবে?
উত্তরাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথমেই মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির প্রকৃত পরিমাণ ও মালিকানা যাচাই করতে হয়। কোনো জমি যৌথ মালিকানাধীন হলে পুরো জমিকে মৃত ব্যক্তির একক সম্পত্তি ধরে ভাগ করা যাবে না; তাঁর মালিকানাধীন অংশটুকুই উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে।
এরপর সম্পত্তির সঙ্গে যুক্ত ঋণ, আইনসম্মত দায় এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বৈধ উইল বা ওসিয়তের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। মুসলিম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে দাফন-কাফনের যুক্তিসংগত ব্যয়, ঋণ এবং বৈধ ওসিয়তের মতো বিষয়গুলো প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী নিষ্পত্তির পর উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করা হয়। ওসিয়তের বৈধতা ও সীমা পরিস্থিতিভেদে যাচাই করা প্রয়োজন।
সব উত্তরাধিকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুর সময় কারা জীবিত ছিলেন, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উত্তরাধিকারী মৃত ব্যক্তির আগেই মারা গেলে তাঁর পরিবারের অধিকার কী হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী আলাদাভাবে পরীক্ষা করতে হয়।
ওয়ারিশ সনদ কি সম্পত্তির ভাগ চূড়ান্ত করে?
না। ওয়ারিশ সনদ সাধারণত মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এটি নিজে থেকেই সব ক্ষেত্রে প্রত্যেকের চূড়ান্ত অংশ নির্ধারণ, জমির নির্দিষ্ট সীমানা ভাগ কিংবা বিরোধপূর্ণ মালিকানা নিষ্পত্তির বিকল্প নয়।
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কে কত অংশ পাবেন, তা প্রযোজ্য আইন ও প্রকৃত পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী হিসাব করতে হয়। কোনো বিরোধ থাকলে আইনজীবীর পরামর্শ বা উপযুক্ত আদালতের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হতে পারে।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি কীভাবে হয়?
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা আইনসম্মত। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির মোট জমিতে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য অংশ উল্লেখ করে আবেদন করা যায়; শুধু যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা না থাকার কারণে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা সমীচীন নয়।
তবে ওয়ারিশরা যদি জমি আলাদা আলাদা অংশে ভাগ করে পৃথক খতিয়ান বা নামজারি করতে চান, তাহলে তাঁদের মধ্যে জমির অবস্থান ও অংশ নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন হতে পারে। বাসসের প্রতিবেদনে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩বি ধারার প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাধারণভাবে জমির উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাজে যে বিষয়গুলো প্রস্তুত রাখতে হয়:
১. মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ।
২. স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ থেকে সংগ্রহ করা ওয়ারিশ সনদ।
৩. জমির দলিল, খতিয়ান ও প্রাসঙ্গিক ভূমি রেকর্ড।
৪. ওয়ারিশদের পরিচয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
৫. যৌথ নামজারি নাকি পৃথক বণ্টন ও নামজারি—তা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আবেদন ও দলিল।
কাগজপত্রের নির্দিষ্ট তালিকা ও প্রক্রিয়া জমির অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধ হলে কী করবেন?
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রথমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির পূর্ণ তালিকা, মালিকানার কাগজপত্র এবং সব উত্তরাধিকারীর তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। এরপর প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ হিসাব করে পারস্পরিক সমঝোতার চেষ্টা করা যেতে পারে।
সমঝোতা হলে জমির নির্দিষ্ট অংশ বণ্টন করে প্রয়োজনীয় বণ্টননামা নিবন্ধন ও নামজারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। সমঝোতা না হলে বিরোধের ধরন অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে। জটিল উত্তরাধিকার, উইল, দান, ঋণ বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল ভাগ এড়াতে সবচেয়ে জরুরি কী?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সব উত্তরাধিকারীকে শনাক্ত করা, মৃত ব্যক্তির প্রকৃত মালিকানাধীন সম্পত্তি নির্ধারণ করা এবং সঠিক আইন অনুযায়ী অংশ হিসাব করা। শুধু প্রচলিত ধারণা, পারিবারিক সিদ্ধান্ত কিংবা ওয়ারিশ সনদের ওপর নির্ভর করে জমির চূড়ান্ত বণ্টন করলে ভবিষ্যতে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, উত্তরাধিকার নির্ধারণ, জমির বণ্টন এবং নামজারি তিনটি সম্পর্কিত হলেও পৃথক প্রক্রিয়া। সঠিক কাগজপত্র, আইনি হিসাব এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধনের মাধ্যমে উত্তরাধিকারীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল: উত্তরাধিকার—সহজেই সম্পত্তির হিসাব
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বা স্থাবর সম্পত্তির নামজারি বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা
বাংলাদেশ সরকারের আইনভান্ডার: The Succession Act, 1925
বিশ্বব্যাংক, Bangladesh: Land Acquisition Diagnostic Review (২০২২)—বাংলাদেশে ভূমি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আইনগত কাঠামোর আলোচনা।