রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রয়োজন মুক্ত চিন্তা

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সবখানেই আলোচনার ঝড়। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে চায়ের টেবিল-সবই উত্তপ্ত রাজনৈতিক সংকটের বিশ্লেষণে। তবে এই সংকটের গভীরে গেলে দেখা যায়, সমস্যাগুলো যতটা না জটিল, তার চেয়ে বেশি কৃত্রিমভাবে জিইয়ে রাখা। রাজনৈতিক দলগুলো মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে কিছু মতভেদকে টিকিয়ে রাখে। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, আমাদের জাতীয় ঐক্যের জায়গাগুলো অনেক বেশি সুদৃঢ়।

১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জন পর্যন্ত আমাদের যে গৌরবোজ্জ্বল পথচলা, তা নিয়ে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের দ্বিমত নেই। এ কে ফজলুল হক, হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতারা আমাদের স্বাধীনতার পথ সুগম করেছেন। তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য এবং এখানে মতভেদের কোনো অবকাশ নেই।

স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজন পড়ে সহস্র সংগ্রামের। সেই সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানীসহ সকল সেক্টর ও সাব-সেক্টর কমান্ডার এবং অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই সত্যটি সব রাজনৈতিক দলই স্বীকার করে।

স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে যে বিতর্কটি আমরা দেখি, তা অনেকটা শিশুতোষ ঝগড়ার মতো। সত্য হলো—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় নিজেকে কখনোই স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। তিনি চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন। এটি একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী মুহূর্ত ছিল। এখানে কারো অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যকে মেনে নিয়ে সকল নেতৃত্বকে যথাযথ স্বীকৃতি দেয়, তবে এই বিতর্ক নিমিষেই মিটে যায়।

সংবিধান তৈরি হয় মানুষের জন্য, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করে। জনমতের ঊর্ধ্বে সংবিধান হতে পারে না। যারা বিতর্ক করেন-‘আগে সংবিধান না কি আগে জনগণ’-তারা মূলত রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকে আছেন। মানুষের ইচ্ছাকে সংবিধানে প্রতিফলিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

পরিশেষে একটি কথাই বলা প্রয়োজন-রাজনৈতিক চেতনা যেন কখনো দেশের চেয়ে বড় না হয়। দলমত নির্বিশেষে যদি আমরা ‘সবার উপরে দেশ’ কথাটি মনে রাখি, তবে দেশের সকল রাজনৈতিক সংকট ও মতভেদ মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের প্রয়োজন কেবল মুক্ত চিন্তা ও সংকীর্ণতামুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি।

লেখক: পিএসসি, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক