২০০ আসনের একটিও পায়নি জাপা, কেনো এই ভরাডুবি?

নানা গুজব এবং নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বিএনপি; সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে দলটি এখন সরকার গঠনের পথে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জোট ৭৭টি আসনে জয় পেয়ে সংসদে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক বা বিপর্যয় হলো সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির (জাপা) ফলাফল। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই প্রথম জাতীয় পার্টি একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি।

জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও চরমভাবে পরাজিত হয়েছে দলটি। জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শামসুজ্জামান শামু পেয়েছেন ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট। বিপরীতে জি এম কাদের মাত্র ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে ধরাশায়ী হয়েছেন। 

এবারের নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর চতুর্থ সর্বোচ্চ প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি (২০০ জন), কিন্তু প্রাপ্তি কেবলই শূন্য।

বিপর্যয়ের মূলে সাড়ে ১৭ বছরের রাজনীতি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লাঙ্গল প্রতীকের এই হার কেবল একটি নির্বাচনি ফল নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।

অভিযোগ রয়েছে, গত সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে জাপা নিজের স্বকীয়তা হারিয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিতে ভূমিকা রেখে দলটি সাধারণ জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের এই ‘দ্বৈত অবস্থান’ ক্ষমতার কাছে থাকাও আবার বিরোধী দলের দাবি করা—ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছে।

জাতীয় পার্টির অতীত নির্বাচনি পরিক্রমা

১৯৯১ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করেছিল এবং এরশাদ জেল থেকে ৫টি আসনে জিতেছিলেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৩২টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয় জাপা। ২০০১ সালে আসন সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৪টিতে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মহাজোটের অংশ হিসেবে জাপা ২৮টি আসন পায়। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলে ৩৪টি আসন নিয়ে জাপা সংসদে প্রধান বিরোধী দল হয়। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে ২২টি এবং ২০২৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে জাপা ১১টি আসন পেয়েছিল। তবে প্রতিবারই তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে (১২% থেকে বর্তমানে প্রায় শূন্য)।

নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি

২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সিদ্ধান্তহীনতা তৃণমূল কর্মীদের হতাশ করেছে। সম্প্রতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু ও রুহুল আমিন হাওলাদারের মতো হেভিওয়েট নেতারা ভোটের আগে আলাদা দল গঠনের কথা বললেও প্রতীক জটিলতায় পিছিয়ে যান। এর আগে মঞ্জুর নেতৃত্বে জেপি এবং নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে বিজেপি গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ বিএনপি জোটের হয়ে জয় পেলেও জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন মূল জাপা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

ভোটব্যাংকের ক্ষয় ও সাংগঠনিক দুর্বলতা

একসময় উত্তরবঙ্গের রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী ছিল জাপার দুর্ভেদ্য দুর্গ। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই দুর্গ তছনছ হয়ে গেছে। তরুণ ভোটারদের কাছে জাপা কোনো আকর্ষণীয় কর্মসূচি তুলে ধরতে পারেনি। মাঠপর্যায়ে বুথ কমিটি বা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অন্য বড় দলগুলোর তুলনায় জাপা ছিল অনেক পিছিয়ে। 

বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা এখন জয়ী হতে পারে এমন শক্তিশালী বিকল্প খুঁজছে, যেখানে জাপা নিজেকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এই ফলাফলের পর জাতীয় পার্টির রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।