খাতা-কলম আর ক্যালেন্ডার হাতে নিয়ে তৈরি হয়ে যান, কারণ মানবজাতি আবার সেই পুরনো প্রেমে পড়তে যাচ্ছে; তবে এবার আরও জাঁকজমকভাবে। অনেক জল্পনা-কল্পনা আর যান্ত্রিক লুকোচুরির পর অবশেষে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা করেছে, সব ঠিক থাকলে আগামী ৬ই মার্চ তাদের ‘আর্টেমিস ২’ মিশনের চার মহাকাশযাত্রী চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে এখন সাজ সাজ রব, যেন অনেক বছর পর বাড়িতে কোনো বড় উৎসবের আয়োজন হচ্ছে।
আসলে ‘উৎসব’ শব্দটা নেহাত মন্দ নয়। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো মিশনের পর আর কোনো মানুষ চাঁদের ছায়া মাড়ায়নি। অর্ধশতাব্দীর সেই খরা কাটাতে এবার ৩২২ ফুট লম্বা এক বিশাল দানবীয় রকেটকে দাঁড় করানো হয়েছে সমুদ্রের তীরের সেই চিরচেনা লঞ্চ প্যাডে। নাসার এক্সপ্লোরেশন সিস্টেম ডেভেলপমেন্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লরি গ্লেজ তো উত্তেজনায় রীতিমতো টগবগ করছেন। তার মতে, এবার আর কোনো কল্পনা নয়, স্বপ্নটা সত্যি হওয়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। যদিও তিনি কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছেন, সামনের সপ্তাহে একটি বিশাল ‘ফ্লাইট রেডিনেস রিভিউ’ (চূড়ান্ত মহড়া) হবে। সেখানে যদি রকেটের স্ক্রু থেকে শুরু করে সফটওয়্যারের কোড; সবকিছু পাশ মার্ক পায়, তবেই ৬ই মার্চ সকালের কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমরা পৃথিবীর চার সন্তানকে মহাকাশে মিলিয়ে যেতে দেখব।
তবে পথটা কিন্তু খুব একটা মসৃণ ছিল না। এই বিশাল রকেটকে পেট ভরে জ্বালানি খাওয়ানোই ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। গতবার যখন নাসা চেষ্টা করেছিল, তখন হাইড্রোজেন লিক করে একাকার অবস্থা। যেন বিশাল এক গ্যাসের বেলুন থেকে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে! শেষমেশ সিল-টিল বদলে, ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের পর যান্ত্রিক গোলযোগগুলো এখন নিয়ন্ত্রণে। এমনকি কন্ট্রোল সেন্টারের যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও কিছুটা ‘খিটখিটানি’ দেখা দিয়েছিল, কিন্তু বিজ্ঞানীরাও নাছোড়বান্দা; ব্যাকআপ ব্যবস্থা দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন যে বাধা আসবেই, কিন্তু যাত্রা থামবে না।
এবার আসি সেই চার রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের কথায়। রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন; এই চারজন এখন এক প্রকার ‘গৃহবন্দি’। না, কোনো শাস্তি নয়, এটাকে বলে কোয়ারেন্টাইন। মহাকাশে যাওয়ার আগে যেন কোনো রোগবালাই বা সর্দি-জ্বর তাদের কাবু না করতে পারে, তাই এই নিভৃতবাস। লরি গ্লেজ তাদের সাথে কথা বলে জানিয়েছেন, তাদের উত্তেজনা এখন আকাশচুম্বী। ৬ লক্ষ মাইলের এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা চাঁদের চারপাশ ঘুরে আসবেন। যদিও তারা এবার চাঁদের মাটিতে পা রাখছেন না, তবে মানুষের চোখ দিয়ে খুব কাছ থেকে চাঁদকে দেখে আসার এই রোমাঞ্চ কম কিসে?
চাঁদের বুড়ি এখন আর রূপকথার গল্প নয় বরং বিজ্ঞানের হাত ধরে মানুষের হাতের নাগালে। ফ্লোরিডার সেই বিশালাকার রকেটটি এখন শুধু গর্জে ওঠার অপেক্ষায়। যদি আবহাওয়া আর ভাগ্য সহায় থাকে, তবে ৬ই মার্চ আমরা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছি।
সূত্র: এনপিআর