এআই কীভাবে বদলে দিচ্ছে রণক্ষেত্র

একসময় যুদ্ধের শক্তি নির্ধারিত হতো সেনাসংখ্যা, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ দিয়ে। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি শক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

কোনো লক্ষ্য শনাক্ত করতে কত সময় লাগবে, হাজার হাজার তথ্যের মধ্যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন ড্রোন কোন পথে যাবে, শত্রুর অবস্থান কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর এখন ক্রমেই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে খোঁজা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে, যেখানে মানুষের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি মেশিনের সিদ্ধান্তও যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

সামরিক বিশ্লেষণে এ পরিবর্তনকে কখনো কখনো ‘হাইপারওয়ার’ বলা হয়—অর্থাৎ এমন যুদ্ধ, যেখানে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসে। তবে এর সঙ্গে বাড়ছে বড় প্রশ্নও: যদি একটি অ্যালগরিদম ভুল করে, সেই ভুলের দায় নেবে কে?

যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের নতুন মুখ

সামরিক ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার শুধু রোবট বা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, স্যাটেলাইট ছবি পরীক্ষা, ড্রোন পরিচালনা, সাইবার নিরাপত্তা, সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং কমান্ড-কন্ট্রোল-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।

স্যাটেলাইট, রাডার, ড্রোন, সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ওপেন সোর্স তথ্য থেকে আসা ডেটা মানুষের পক্ষে দ্রুত বিশ্লেষণ করা কঠিন। এআই সেই কাজ অনেক দ্রুত করতে পারে।

এর ফলে সামরিক কমান্ডাররা যুদ্ধক্ষেত্রের একটি প্রায় তাৎক্ষণিক চিত্র পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। কোথায় সেনা বা যান রয়েছে, কোন এলাকায় পরিবর্তন ঘটছে, কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ—এসব শনাক্ত করতে অ্যালগরিদম সহায়তা করতে পারে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ‘sensor-to-shooter’ লুপের গতি বৃদ্ধি। অর্থাৎ কোনো লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যকার সময় কমে আসছে।

একটি ড্রোনের তুলনায় শত শত ছোট ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ধারণাটি অনেকটা পিঁপড়া বা মৌমাছির দলের মতো—প্রতিটি ইউনিট সীমিত কাজ করলেও সম্মিলিতভাবে তারা একটি বড় মিশন সম্পন্ন করতে পারে।

এআই-নির্ভর সোয়ার্ম ব্যবস্থায় একাধিক ড্রোন নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করতে পারে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী গতিপথ বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। একটি ইউনিট অকার্যকর হলেও অন্য ইউনিটগুলো মিশন চালিয়ে যেতে পারে—এমন ব্যবস্থাই সামরিক পরিকল্পনাকারীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।

এর ফলে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম খরচের বহু ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত বা বিভ্রান্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র কতটা বদলে দিতে পারে। তবে প্রতিটি ড্রোন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ এখনো লক্ষ্য নির্বাচন, অনুমোদন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

‘মানুষের চোখ’ থেকে ‘মেশিনের চোখ’

যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তথ্য বিশ্লেষণের গতি।

ধরা যাক, কয়েক হাজার স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ, রাডার সংকেত ও যোগাযোগ-তথ্য একই সময়ে পাওয়া গেল। একজন মানুষের পক্ষে এসব তথ্য দ্রুত পরীক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। এআই এসব তথ্যের মধ্যে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন খুঁজে বের করতে পারে।

ফলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে লক্ষ্য শনাক্তকরণ পর্যন্ত বহু ধাপে মানুষের ওপর চাপ কমে আসতে পারে।

কিন্তু এখানেই রয়েছে বড় ঝুঁকি। মেশিন কোনো ছবিতে একটি বস্তু শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু সেটি সামরিক লক্ষ্য নাকি বেসামরিক স্থাপনা—তা সবসময় নির্ভুলভাবে বুঝতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

যুদ্ধক্ষেত্রে একটি ভুল শনাক্তকরণ এর অর্থ হতে পারে মানুষের প্রাণহানি।

মানুষ ‘ইন দ্য লুপ’ থাকবে তো?

সামরিক এআই নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কগুলোর একটি হলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা।

‘Human-in-the-loop’ ব্যবস্থায় প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মানুষের সরাসরি অনুমোদন থাকে। অন্যদিকে ‘Human-on-the-loop’ ব্যবস্থায় মানুষ পুরো ব্যবস্থার তদারকি করেন, কিন্তু প্রতিটি সিদ্ধান্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ নাও করতে পারেন।

আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে একটি মেশিন নিজেই লক্ষ্য শনাক্ত, নির্বাচন এবং আক্রমণের ধারাবাহিকতা সম্পন্ন করতে পারে।

এই জায়গাতেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রশ্ন সামনে আসে।

যুদ্ধের সময় বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করা এবং আক্রমণের সামরিক প্রয়োজনীয়তা বিচার করা—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে নৈতিক ও আইনি দায় জড়িত। অ্যালগরিদম কি এসব বিষয় মানুষের মতো বুঝতে পারবে? প্রশ্নটির উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা

সামরিক এআই নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সামরিক আধুনিকায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, স্বায়ত্তশাসিত প্ল্যাটফর্ম, সাইবার সক্ষমতা এবং কমান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থায় বেসরকারি প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে।

চীন ‘Intelligentized Warfare’ বা বুদ্ধিমান যুদ্ধের ধারণাকে সামনে রেখে সামরিক আধুনিকায়নে এআই যুক্ত করছে। দেশটির বেসামরিক প্রযুক্তি খাত ও সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রাশিয়া তুলনামূলক ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং তথ্যযুদ্ধের ব্যবহার বাড়িয়েছে।

এই প্রতিযোগিতার মূল প্রশ্ন হচ্ছে—কে দ্রুততর সিদ্ধান্ত নিতে পারে?

কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের পার্থক্য কখনো কখনো কৌশলগত ফলাফল বদলে দিতে পারে।

শুধু আকাশে নয়, সাইবার জগতেও যুদ্ধ

এআইয়ের যুদ্ধক্ষেত্র শুধু বন্দুক, ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র নয়। সাইবার জগতও এখন গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র।

জেনারেটিভ এআই দিয়ে ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও ও বার্তা তৈরি করা আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফলে একটি দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করা, সামরিক বাহিনীর মনোবলে আঘাত করা কিংবা রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা আরও সহজ হতে পারে।

এখানে ‘ডিপফেক’ বিশেষ উদ্বেগের কারণ। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কণ্ঠে তৈরি একটি ভুয়া বার্তা যদি যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে, সেটি সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

একইভাবে এআই-ভিত্তিক সাইবার ব্যবস্থা দ্রুত কোনো নেটওয়ার্কের দুর্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম হলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের যুদ্ধ হয়তো একই সঙ্গে আকাশে, স্থলে, সমুদ্রে, মহাকাশে, সাইবার জগতে এবং মানুষের মস্তিষ্কে সংঘটিত হবে।

সবচেয়ে বড় ভয়, মেশিনের ভুল

এআই যত শক্তিশালীই হোক, এটি ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। মেশিন লার্নিং ব্যবস্থা যে তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়, তার মানের ওপর ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করে। অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

আরেকটি সমস্যা হলো ‘ব্রিটলনেস’। কোনো ব্যবস্থা পরীক্ষাগারে ভালো কাজ করলেও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে একইভাবে কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

শত্রুপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কোনো এআই ব্যবস্থাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সামরিক ব্যবস্থায় এ ধরনের ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যখন দুই পক্ষের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা পরস্পরের কর্মকাণ্ডকে আক্রমণ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে।

একটি ভুল সংকেত → দ্রুত অ্যালগরিদমিক প্রতিক্রিয়া → পাল্টা প্রতিক্রিয়া—এই ধারাবাহিকতা যদি মানুষের হস্তক্ষেপের আগেই এগিয়ে যায়, তাহলে একটি ছোট সংঘাত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও ভয়াবহ

এআই নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের জায়গা হলো পারমাণবিক কমান্ড, কন্ট্রোল ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। পারমাণবিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিটি পক্ষ ধরে নেয় যে বিপদের মুহূর্তে তাদের সক্ষমতা কার্যকর থাকবে। কিন্তু যদি কোনো রাষ্ট্র মনে করে তার পারমাণবিক অস্ত্র বা কমান্ড ব্যবস্থা শত্রুর হামলায় ধ্বংস হতে পারে, তখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভুল সতর্কসংকেত বা ভুল অ্যালগরিদমিক বিশ্লেষণের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। তাই পারমাণবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়টি শুধু নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

এআই কি মানুষকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেবে?

এআইয়ের সমর্থকেরা বলছেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বিপজ্জনক পরিবেশে মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে। মাইন শনাক্তকরণ, নজরদারি, উদ্ধার অভিযান কিংবা উচ্চঝুঁকির এলাকায় তথ্য সংগ্রহে রোবট ও ড্রোন মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।

কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ যদি মানুষের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক শক্তি ব্যবহারে আরও সহজে আগ্রহী হতে পারে।

অর্থাৎ প্রযুক্তি যুদ্ধকে ‘সহজ’ করলে যুদ্ধের সংখ্যা কমবে, নাকি বাড়বে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।