ক্যামেরা চলছে। লেন্সের সামনে দিয়ে আপনি হেঁটে যাচ্ছেন। পুলিশের সঙ্গে কথাও বলছেন। অথচ ক্যামেরার ফুটেজে আপনার মুখ, গাড়ির নম্বরপ্লেট কিংবা কোনো বস্তুর পরিচয় ঠিকভাবে শনাক্তই করা যাচ্ছে না! শুনতে সিনেমার গল্পের মতো মনে হলেও এমন প্রযুক্তি এখন দ্বারপ্রান্তে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান নজরদারির যুগে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার নতুন পথ দেখাচ্ছে ‘নো রিকগনেশন’ প্রযুক্তি। মার্কিন সাইবার বিশেষজ্ঞ বিল সোয়্যারিনগেন এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য মুছে না ফেলেও স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে কার্যত বিভ্রান্ত করতে পারে।
পোশাকে বিশেষ প্যাটার্ন, ক্যামেরায় বিভ্রান্তি
প্রযুক্তিটির মূল কৌশল বেশ চমকপ্রদ। প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ ডেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ ধরনের কম্পিউটার-জেনারেটেড প্যাটার্ন। এসব প্যাটার্ন পোশাক কিংবা বিভিন্ন বস্তুর ওপর প্রয়োগ করা হলে ক্যামেরার অবজেক্ট শনাক্তকারী অ্যালগরিদম সেগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
অর্থাৎ ক্যামেরা আপনাকে দেখতে পাবে, কিন্তু তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো বুঝতে পারবে না—সে আসলে কাকে বা কী দেখছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তি ক্যামেরার ভিডিও ধারণ বন্ধ করে না। ক্যামেরা আগের মতোই ভিডিও রেকর্ড করতে পারে। কিন্তু সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মানুষের মুখ, কোনো বস্তু কিংবা গাড়ির লাইসেন্স প্লেট শনাক্ত করার স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
ফলে কোনো ব্যক্তিকে অনুসরণ করার জন্য ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং অ্যালগরিদম প্রয়োজনীয় সংকেত না-ও পেতে পারে। একইভাবে শনাক্তকরণভিত্তিক অ্যালার্টও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এআইয়ের চোখে ‘অদৃশ্য’ হওয়ার চেষ্টা
বিল সোয়্যারিনগেন এই প্রযুক্তিকে শুধু একটি সাইবার নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে দেখছেন না। তার দৃষ্টিতে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি থেকে নিজেকে ‘অপ্ট-আউট’ করার একটি সম্ভাব্য অধিকার।
বিশ্বজুড়ে শহর, রাস্তা, বিপণিবিতান, পরিবহনব্যবস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নজরদারি ক্যামেরার ব্যবহার বাড়ছে। নিরাপত্তার জন্য এসব ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। বিশেষ করে ক্যামেরার ফুটেজ যখন এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে মানুষের পরিচয়, চলাফেরা বা আচরণ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘নো রিকগনেশন’ প্রযুক্তি সেই বিতর্কেই নতুন মাত্রা যোগ করছে।
১১টি অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে সফল পরীক্ষা
সোয়্যারিনগেন তার এআই মডেলকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন নতুন প্যাটার্ন তৈরি করতে পারে। এসব প্যাটার্নের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে ১১টি ওপেন-সোর্স অ্যালগরিদমের বিরুদ্ধে।
পরীক্ষায় ফ্লক লাইসেন্স প্লেট রিডার, অ্যাক্সন বডি ক্যামেরা এবং ক্লিয়ারভিউ এআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির শনাক্তকরণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্যাটার্নগুলো কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
শুধু গবেষণাগারে পরীক্ষা করেই থেমে থাকেননি উদ্ভাবক। লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ডেফ কন সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলনেও প্রযুক্তিটির বাস্তব পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে বিশেষ প্যাটার্নযুক্ত একটি গাড়ি ব্যবহার করে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়।
এবার বাজারে আসছে ‘গোপনীয়তার পোশাক’
গবেষণাগার ও সম্মেলনের পরীক্ষার পর প্রযুক্তিটির পরবর্তী ধাপ হতে পারে সাধারণ মানুষের ব্যবহার। শিগগিরই এসব বিশেষ প্যাটার্নযুক্ত পোশাক বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভাবুন, এমন একটি পোশাক আপনি পরেছেন, যার নকশা মানুষের চোখে হয়তো সাধারণ বা অদ্ভুত মনে হবে; কিন্তু ক্যামেরার এআইয়ের কাছে সেটিই হয়ে উঠবে একটি বড় বিভ্রান্তি। আপনার চলাফেরা ক্যামেরায় ধরা পড়লেও স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আপনাকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারবে না—এটাই প্রযুক্তিটির মূল ধারণা।
নিরাপত্তা বনাম গোপনীয়তা—নতুন বিতর্ক
তবে এই প্রযুক্তির উত্থান নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে আনছে। অপরাধী বা আইন ভঙ্গকারীরা যদি এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি এড়াতে চায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারও অস্বীকার করা যায় না। একজন মানুষ সবসময় চান না যে তার প্রতিটি চলাফেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো ডেটাবেসে শনাক্ত বা বিশ্লেষিত হোক।
সেখানেই ‘নো রিকগনেশন’ প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিরাপত্তার জন্য কতটা নজরদারি প্রয়োজন, আর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্য কতটা গোপনীয়তা জরুরি?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন ক্রমেই মানুষের পরিচয় শনাক্ত করার ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন সেই শনাক্তকরণকে ঠেকানোর প্রযুক্তিও যে তৈরি হবে, সেটি হয়তো সময়েরই স্বাভাবিক পরিণতি। আগামী দিনে ক্যামেরা থাকবে, এআইও থাকবে; কিন্তু মানুষ হয়তো প্রযুক্তির চোখে কতটা দৃশ্যমান থাকবে, সেই সিদ্ধান্তের কিছুটা ক্ষমতা নিজের হাতেও রাখতে চাইবে।
‘নো রিকগনেশন’ প্রযুক্তি সেই ভবিষ্যতেরই একটি সম্ভাব্য পূর্বাভাস। আকর্ষণীয় শিরোনাম
নতুন ৫জি স্মার্টফোন আনছে ইনফিনিক্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রথমবার তৈরি হলো ভাইরাস!
আকাশে ইরানের নতুন 'অদৃশ্য' শিকারি: ড্রোন 'হাদিদ ১১০'
স্বয়ংক্রিয় সাইবার হামলা চালালো ওপেনএআই'র অত্যাধুনিক মডেল