'মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘আতঙ্কিত’ এআই কর্মীরা'

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি এবং এর সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে প্রযুক্তি খাতের অনেক কর্মী গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এমনকি এআই নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের কেউ কেউ মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়েও আতঙ্কিত বলে জানিয়েছেন অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন।

বিবিসির লরা কুয়েন্সবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কক্সন বলেন, এআই প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতির গতি কমানো না হলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের চাকরি ছাড়ার পর দেওয়া তাঁর একটি পদত্যাগপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এমন এআই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

কক্সনের ভাষ্য, বর্তমান গতিতে এআইয়ের উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে মানবজাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর মতে, এআই নিয়ে কাজ করা অনেক মানুষই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তারা সত্যিই ভীত।

এআই নিরাপত্তা নিয়ে কক্সনের উদ্বেগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন তাঁর সাবেক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেইও প্রযুক্তিটির উন্নয়নের গতি কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। শনিবার প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রিত অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

তবে এআই খাতের সবাই এমন আশঙ্কার সঙ্গে একমত নন। কিছু প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে করেন, এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তাগুলো অতিরঞ্জিত হতে পারে। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্যের পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা নিয়ন্ত্রণমূলক আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।

কক্সন, যিনি ২৭ বছর বয়সী ব্রিটিশ গবেষক এবং এআই মডেল প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করেছেন, বলেন এআইয়ের সম্ভাব্য দখল বা নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষ ব্যক্তিরাও অতীতে সতর্ক করেছেন। তাঁর মতে, ইলন মাস্ক ও ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানসহ অনেকেই এআইয়ের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

তবে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হলো, এআই কীভাবে বাস্তবে মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কক্সনের মতে, সম্ভাব্য অনেক দৃশ্যপট শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হয়। কিন্তু অতীতে যেসব এআই সক্ষমতা কল্পনাতীত মনে হতো, সেগুলোর কিছু এখন বাস্তব হয়ে উঠেছে।

সম্ভাব্য একটি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কক্সন বলেন, ভবিষ্যতের স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট চিকিৎসা গবেষণাগারে প্রবেশ করে প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরির মতো কাজ করতে পারে। একইভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা ‘ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এ সাইবার হামলা চালানোর সক্ষমতাও অর্জন করতে পারে এসব সিস্টেম।

নিজের আশঙ্কার পক্ষে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ওপেনএআইয়ের এক প্রতিবেদনে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে তাদের প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিং কার্যক্রমের কথা উঠে এসেছিল। কক্সনের দাবি, এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে এআই সিস্টেম ক্রমেই এমন কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম হচ্ছে, যা আগে মানুষের সরাসরি নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান আমোদেই যে ঝুঁকির কথা বলেছেন, তার মধ্যে একটি হলো বিপুলসংখ্যক বট একসঙ্গে কাজ করে একটি বিশাল ‘সুপারকম্পিউটার’-সদৃশ শক্তিতে পরিণত হওয়া এবং ইন্টারনেটের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। কক্সনের মতে, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই এমন পরিস্থিতি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে।

তবে কক্সনের বক্তব্যের সমালোচনাও রয়েছে। এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ দেলাংগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কক্সনের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে কক্সনের অবস্থানকে প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংও এ ধরনের আশঙ্কাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে বিবিসিকে কয়েকজন জানিয়েছেন। এর আগে হুয়াং বলেছিলেন, এআই মানবজাতির অবসান ঘটাবে এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

এআই নিয়ে এই বিতর্কের পেছনে বড় অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই উভয় প্রতিষ্ঠানই সম্ভাব্য বড় আকারের শেয়ারবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদন রয়েছে। ফলে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, এআইয়ের শক্তি ও বিপদ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বাজারে আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা থাকতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের আটকে রাখার উদ্দেশ্যেও এসব সতর্কবার্তা ব্যবহার করা হতে পারে।

কক্সনের মতে, এআই গবেষণায় গতি কমানোর উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানকে নয়, বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে চীনের এআই উন্নয়নও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চান, কারণ তারা নিজেদের একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন। একদিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চাপ, অন্যদিকে সেই দৌড়ের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ভয়—দুইয়ের মধ্যে তারা সংকটে রয়েছেন।

কক্সনের দাবি, এআই খাতে কাজ করা কিছু মানুষ আগামী দুই বছরের মধ্যেই মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করছেন।

তবে এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন কক্সন। তিনি বলেন, প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা গবেষকদের অনেকেই এআইয়ের ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখতে চান। রোগ নিরাময়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এআই বড় ভূমিকা রাখতে পারে এমন আশাবাদও তাদের রয়েছে।

কক্সনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর অ্যানথ্রপিকের বিজ্ঞানী ইভান হাবিঙ্গারও তাঁর সঙ্গে একমত হওয়ার কথা জানান। তিনি দাবি করেন, এআইয়ের কারণে সব মানুষ মারা যেতে পারে এমন সম্ভাবনাকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে আগামী এক দশকে ১০ শতাংশের বেশি বলে মনে করেন।

এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৩ সালেই ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড ও অ্যানথ্রপিকের শীর্ষ কর্মকর্তারা উন্নত এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এআই সিস্টেমের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জও সামনে আসায় সেই সতর্কবার্তা আরও জোরালো হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এআইয়ের উন্নয়ন কি থামানো সম্ভব, নাকি এর গতি নিয়ন্ত্রণ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ খুঁজতে হবে? প্রযুক্তি খাতের ভেতরের এই বিতর্ক আগামী দিনে শুধু এআই শিল্পের নয়, বরং বৈশ্বিক নীতি, নিরাপত্তা এবং মানবতার ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।