ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনী। পেরিম নামেও পরিচিত এই আগ্নেয় দ্বীপের অবস্থান বাব আল-মান্দাব প্রণালির ঠিক মাঝখানে। ফলে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের জন্য শুধু ইয়েমেনের ভূখণ্ডগত অগ্রগতি নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তারেরও সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মায়ুন দ্বীপটি বাব আল-মান্দাবকে দুটি নৌপথে ভাগ করেছে। দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে এখান থেকে প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ অংশ পর্যবেক্ষণ ও সামুদ্রিক চলাচলে নজরদারি করা সম্ভব।
এর আগে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং বন্দরনগর মোখার নিয়ন্ত্রণও হুথিদের হাতে যাওয়ায় মায়ুন দখলের তাৎপর্য আরও বেড়েছে। উপকূল ও দ্বীপ দুই জায়গায় অবস্থান শক্ত করতে পারলে বাব আল-মান্দাবের জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা হুথিদের অনেকটাই বাড়বে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন?
বাব আল-মান্দাব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রণালির মাঝখানে অবস্থান করায় মায়ুন দ্বীপের সামরিক মূল্য অনেক বেশি। দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে থাকলে প্রণালির দুই নৌপথের ওপর নজরদারি, সামুদ্রিক চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে জাহাজ চলাচলে হুমকি তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্টাই আল জাজিরাকে বলেছেন, হুথিদের হাতে এখন বাব আল-মান্দাব দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার বাস্তব সক্ষমতা তৈরি হয়েছে তারা চাইলে এমনটা করতে পারে।
তবে ‘নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা’ এক বিষয় নয়। কোনো জলপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে শুধু একটি দ্বীপ দখল করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি, নজরদারি ব্যবস্থা, বিমান প্রতিরক্ষা, উপকূলীয় অস্ত্র এবং সরবরাহব্যবস্থাও প্রয়োজন।
দখল করা যতটা সহজ, ধরে রাখা কি ততটাই সহজ?
মায়ুন দ্বীপ দখল হুথিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক আন্দ্রিয়াস ক্রিগের মতে, স্বল্পমেয়াদে দ্বীপটি রক্ষা করার ক্ষেত্রে হুথিদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। কারণ দ্বীপটির কাছাকাছি মূল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় জনবল, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। সমুদ্রপথে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপকে বড় ধরনের উভচর সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে রক্ষা করা কঠিন। প্রতিপক্ষ যদি সমুদ্র ও আকাশপথে শক্তিশালী অভিযান চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে দ্বীপটির প্রতিরক্ষা বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
অর্থাৎ মায়ুন দখল হুথিদের জন্য একটি কৌশলগত বিজয় হলেও সেটিকে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা আলাদা চ্যালেঞ্জ।
মোখা ও মায়ুন একসঙ্গে বড় পরিবর্তন
মায়ুনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ হুথিদের হাতে লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণও সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে মোখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগর তাদের নিয়ন্ত্রণে আসায় মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটির দিকে সামরিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর ফলে হুথিদের হাতে এখন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, বরং দ্বীপের আশপাশের উপকূলও রয়েছে। এই সমন্বিত ভৌগোলিক অবস্থান বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
হুথিরা আগে থেকেই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা দেখিয়েছে। মায়ুনের অবস্থান তাদের এসব সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বাব আল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সমুদ্রবাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই অঞ্চলের নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল।
আগেও হুথিদের হামলার কারণে অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘতর পথে চলাচল করেছে। এতে জাহাজের সময় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে।
মায়ুনের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে দীর্ঘস্থায়ী হলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন সময় দীর্ঘ হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে বৈশ্বিক বাজারে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
মায়ুনের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য নতুন কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাব আল-মান্দাবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীকে শুধু সমুদ্রপথে টহল দিলেই হবে না, দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকাতেও হুথিদের সামরিক অবকাঠামো নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে।
কিন্তু সরাসরি দ্বীপে সামরিক অভিযান চালানো হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্ত হুথিদের সম্পর্ক থাকায় ইয়েমেনের এই আঞ্চলিক সংঘাত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে?
মায়ুন দ্বীপ দখলের মাধ্যমে হুথিরা বাব আল-মান্দাবের খুব কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান পেয়েছে। তাদের হাতে কাছাকাছি উপকূল ও মোখা থাকার কারণে স্বল্পমেয়াদে দ্বীপটি ধরে রাখার সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর দ্বীপে হুথিদের সামরিক অবকাঠামো কতটা শক্তিশালী করা যায়, তারা কীভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মায়ুন দখলকে শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের আরেকটি ভূখণ্ডগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন একটি স্থানে ঘটেছে, যেখানে একটি ছোট আগ্নেয় দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রশ্ন এখন শুধু হুথিরা মায়ুন দখল করতে পেরেছে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, তারা এই কৌশলগত অবস্থান কতদিন ধরে রাখতে পারবে এবং বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের নতুন সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করবে।
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আবারও গুলির শব্দ
ইরানের ‘পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা’ প্রয়োজন :ইরানি আইনপ্রণেতা
হরমুজে জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাত, জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ
আয়ারল্যান্ডের পুনরেকত্রীকরণ ‘দারুণ হবে’: ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
পশ্চিম উপকূলে ফের যুদ্ধের প্রস্তুতি
লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, পেছালো রোম বৈঠক