মানুষ যদি একদিন সত্যিই পশু-পাখির ভাষা বুঝতে পারে, কেমন হবে সেই পৃথিবী? পাখির ডাক শুনে জানা যাবে সে বিপদের সংকেত দিচ্ছে, হাতির গর্জন থেকে বোঝা যাবে তার অনুভূতি, আর সমুদ্রের গভীরে তিমির অসংখ্য ‘ক্লিক’ শব্দ হয়তো একদিন মানুষের কাছে অর্থবহ বার্তায় রূপ নেবে।
শুনতে অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স ও জীববিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতিতে সেই কল্পনার কিছুটা এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন—প্রাণীরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাদের শব্দের মধ্যে কী ধরনের নিয়ম বা কাঠামো রয়েছে এবং নির্দিষ্ট শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট আচরণের কী সম্পর্ক—তা এআইয়ের সাহায্যে খুঁজে বের করতে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনো প্রাণীর ভাষা ‘অনুবাদ’ করে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন করার পর্যায়ে পৌঁছাননি। বরং তারা এমন একটি অজানা যোগাযোগব্যবস্থার কাঠামো বোঝার চেষ্টা করছেন, যার অর্থ আগে থেকেই মানুষের জানা নেই।
সমুদ্রের গভীরে ‘প্রজেক্ট সেটি’
এই গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগগুলোর একটি হলো Project CETI (Cetacean Translation Initiative)। ক্যারিবীয় দ্বীপ ডমিনিকার আশপাশের সমুদ্রে স্পার্ম তিমির যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছে প্রকল্পটি।
স্পার্ম তিমি একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত পরপর তৈরি হওয়া ক্লিকের ধ্বনি ব্যবহার করে। এসব শব্দের নির্দিষ্ট বিন্যাসকে বলা হয় ‘কোডা’ (coda)।
গবেষকদের লক্ষ্য হলো বিপুল পরিমাণ তিমির শব্দ, তাদের চলাফেরা, সামাজিক সম্পর্ক ও পরিবেশগত পরিস্থিতির তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা। এর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে পানির নিচের হাইড্রোফোন, রোবোটিক সেন্সর, ড্রোন ও তিমির শরীরে সাময়িকভাবে সংযুক্ত করা বিশেষ সেন্সর।
Project CETI-এর গবেষণায় এরই মধ্যে দেখা গেছে, স্পার্ম তিমির ডাক সম্পূর্ণ এলোমেলো নয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট ধরনের কোডা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি কোডাগুলোর বিন্যাস ও গতিতেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়।
গবেষকেরা মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে এই বিপুল শব্দভান্ডারের মধ্যে পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন খুঁজছেন। তাদের লক্ষ্য—কোন শব্দ কখন, কীভাবে এবং কোন সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা বোঝা।
২০২৫ সালেও Project CETI-এর গবেষণায় স্পার্ম তিমির কোডা শনাক্ত ও বিশ্লেষণের নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
তিমির ‘ক্লিক’ কি ভাষা?
এখানেই শুরু হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন—তিমির এসব শব্দ কি সত্যিই ভাষা?
মানুষের ভাষার সঙ্গে প্রাণীর যোগাযোগব্যবস্থার তুলনা করা সহজ নয়। মানুষের ভাষায় শব্দ, বাক্য, ব্যাকরণ ও বিমূর্ত ধারণা রয়েছে। অন্যদিকে প্রাণীদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শব্দের পাশাপাশি শরীরের ভঙ্গি, গন্ধ, স্পর্শ, অবস্থান এবং পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কিছু প্রাণীর যোগাযোগব্যবস্থা আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
Project CETI-এর গবেষণায় স্পার্ম তিমির কোডার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাঠামো ও পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে। গবেষকেরা এমনকি শব্দের মধ্যে স্বরধ্বনির মতো বৈশিষ্ট্যের সম্ভাব্য প্রমাণও অনুসন্ধান করছেন।
অর্থাৎ, প্রাণীরা মানুষের মতো ভাষা ব্যবহার করে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে তাদের যোগাযোগকে নিছক ‘এলোমেলো শব্দ’ হিসেবেও দেখা যাচ্ছে না।
শুধু তিমি নয়, কাক-হাতি-পাখিও গবেষণার আওতায়
প্রাণীর যোগাযোগ বোঝার চেষ্টা শুধু সমুদ্রের প্রাণীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Earth Species Project (ESP) বিভিন্ন প্রাণীর শব্দ বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার করছে। তাদের NatureLM-audio-এর মতো মডেল বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর শব্দ শনাক্ত ও শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে।
এ ধরনের মডেলের মাধ্যমে পাখি, তিমি, উভচরসহ বহু প্রাণীর শব্দের মধ্যে মিল ও পার্থক্য শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এখানে মূল সুবিধা হলো—মানুষের পক্ষে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ ঘণ্টার রেকর্ডিং হাতে শুনে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এআই বিপুল পরিমাণ অডিও ডেটা খুব দ্রুত পরীক্ষা করে একই ধরনের শব্দ, সময়ের ব্যবধান, ছন্দ ও পুনরাবৃত্তি শনাক্ত করতে পারে।
শব্দের সঙ্গে আচরণ মিলিয়ে অর্থ খোঁজা
প্রাণীর ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে শুধু শব্দ রেকর্ড করলেই হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শব্দের সঙ্গে আচরণের সম্পর্ক খুঁজে বের করা।
ধরা যাক, একটি পাখি একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডাক দিল। সেই সময় কি কোনো শিকারি আশপাশে ছিল? নাকি তার খাবার পাওয়া গেছে? নাকি সে তার সঙ্গীকে ডাকছিল?
একইভাবে, একটি তিমি নির্দিষ্ট ধরনের কোডা ব্যবহার করার সময় কি দলের অন্য সদস্যদের কাছে যাচ্ছিল? নাকি দল থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল?
এই তথ্যগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই এআই সম্ভাব্য অর্থ বা কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
Project CETI-এর গবেষণাপদ্ধতিতেও শব্দের সঙ্গে তিমির আচরণ ও পরিবেশগত তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের গবেষণাপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো—তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে প্যাটার্ন শনাক্ত এবং পরে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে সেই ধারণা যাচাই করা।
তাহলে কি একদিন মানুষ তিমির সঙ্গে কথা বলবে?
সম্ভাবনাটি রোমাঞ্চকর। কিন্তু বাস্তবতা এখনো অনেক দূরে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় প্রাণীর যোগাযোগে মেশিন লার্নিংয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে কোনো অমানবিক প্রাণীর প্রাকৃতিক যোগাযোগব্যবস্থার কার্যকর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। মানুষের সঙ্গে প্রাণীর দ্বিমুখী কথোপকথন আরও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
কারণ সমস্যাটি শুধু ‘কোন শব্দের অর্থ কী’—তা বের করার নয়।
প্রাণীরা হয়তো এমন কিছু অনুভব করে বা পরিবেশ উপলব্ধি করে, যা মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়। তিমি শব্দের মাধ্যমে পানির নিচের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে, হাতি কম্পন অনুভব করতে পারে, আবার কোনো পাখির কাছে নির্দিষ্ট শব্দের অর্থ তার সামাজিক পরিবেশের ওপর নির্ভর করতে পারে।
তাই এআই হয়তো প্রথমে মানুষের মতো বাক্য অনুবাদ করবে না। বরং বলতে পারে—‘এই সংকেতটি বিপদের সঙ্গে সম্পর্কিত’, ‘এই ডাকটি সামাজিক যোগাযোগের সময় বেশি ব্যবহৃত হয়’ অথবা ‘এই শব্দটি নির্দিষ্ট দলের সদস্যদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।’
‘অনুবাদ’ নাকি প্যাটার্ন শনাক্তকরণ?
এখানেই বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।
এআই কোনো শব্দ বারবার শনাক্ত করলেই তার অর্থ বুঝে ফেলেছে—এমন নয়। একটি অ্যালগরিদম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু সেই প্যাটার্নের প্রকৃত অর্থ কী, তা নিশ্চিত করতে স্বাধীন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রয়োজন।
এই কারণে গবেষকেরা ‘প্লেব্যাক এক্সপেরিমেন্ট’-এর মতো পদ্ধতি ব্যবহার করেন। কোনো নির্দিষ্ট সংকেতের সম্ভাব্য অর্থ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর সেই সংকেত আবার প্রাণীর কাছে বাজিয়ে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রতিক্রিয়া একই রকম হলে অনুমানটি আরও শক্তিশালী হয়।
অর্থাৎ, এআই এখানে একজন ‘অনুবাদক’ হওয়ার পাশাপাশি একজন অত্যন্ত শক্তিশালী তথ্য বিশ্লেষকের ভূমিকাও পালন করছে।
প্রাণীর ভাষা বুঝলে বদলে যেতে পারে সংরক্ষণনীতি
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু কৌতূহল মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রাণীরা কীভাবে যোগাযোগ করে, কোথায় তাদের সামাজিক দল তৈরি হয়, কোন শব্দের মাধ্যমে বিপদের সংকেত দেয় কিংবা মানুষের শব্দদূষণে তাদের যোগাযোগ কীভাবে পরিবর্তিত হয়—এসব জানা গেলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নতুন পথ খুলতে পারে।
বিশেষ করে সমুদ্রের প্রাণীদের ক্ষেত্রে জাহাজের শব্দ ও অন্যান্য মানবসৃষ্ট শব্দ তাদের যোগাযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পার্ম তিমির শব্দ ব্যবহারে পরিবেশগত শব্দের প্রভাব নিয়েও নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে একদিন এআই হয়তো শুধু ‘তিমি কী বলছে’ তা জানার প্রযুক্তি হবে না; বরং ‘তিমি কোথায় বিপদে আছে’ কিংবা ‘মানুষের কর্মকাণ্ড তাদের আচরণ কীভাবে বদলে দিচ্ছে’—সেটিও বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়
প্রাণীর ভাষা বোঝার প্রযুক্তি যত এগোবে, ততই নতুন একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসবে—মানুষ যদি সত্যিই অন্য প্রাণীর যোগাযোগ বুঝতে পারে, তাহলে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কি বদলে যাবে?
২০২৬ সালের একটি গবেষণায়ও প্রাণীর যোগাযোগে মেশিন লার্নিং ব্যবহারের নৈতিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে মানুষ ও অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে যোগাযোগের প্রযুক্তি তৈরি হলে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতাই নয়, তার সামাজিক ও নৈতিক প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।
সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
আমরা যদি একদিন নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে তিমি, হাতি, পাখি কিংবা অন্য প্রাণীরা জটিল সামাজিক বার্তা আদান-প্রদান করে, তাহলে ‘মানুষই একমাত্র ভাষাবান প্রাণী’—এই পুরোনো ধারণা নতুন করে ভাবতে হবে।
হয়তো ভবিষ্যতের এআই আমাদের প্রাণীদের সঙ্গে হুবহু কথা বলার সুযোগ দেবে না। কিন্তু তাদের পৃথিবীকে কিছুটা বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
আর সেই বোঝাপড়াই হয়তো মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বদলে দেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠবে।
লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত অন্তত ৪
কিস্তিতে মিলছে ভিভো ভি৮০ লাইট
টিম কুকের বিদায়, অ্যাপলের নতুন সিইও জন টার্নাস
এআই কীভাবে বদলে দিচ্ছে রণক্ষেত্র
এআইয়ের সহায়তায় বিশ্বে প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচার
ইরানের প্রতিরোধ শক্তি আরও বেড়েছে: সাইয়ারি
১০০ শিক্ষককে সম্মাননা দেবে সরকার: শিক্ষামন্ত্রী