মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের (জেডব্লিউএসটি) চেয়েও দূরবর্তী ও গভীর মহাকাশে নজরদারি চালাতে নতুন একটি স্পেস টেলিস্কোপ তৈরির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
নাসার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘প্রাইমা’ (PRIMA - প্রোপ ফার-ইনফ্রারেড মিশন ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স) নামের নতুন এই অভিযানটি প্রাথমিক ডিজাইন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা 'ফেজ-বি' ধাপে উন্নীত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়া শুরু করার আগে নাসার কর্মকর্তারা মিশনটির সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে ২০৩৩ সালের দিকে অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদি এই অভিযানে যাত্রা করবে প্রাইমা।
প্রাইমা মিশনে ৫.৯ ফুট (১.৮ মিটার) চওড়া একটি টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হবে, যা অতি-অবলোহিত বা ফার-ইনফ্রারেড আলোকতরঙ্গে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করবে। এটি ২০২১ সালে উৎক্ষেপণ করা বিখ্যাত জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের চেয়ে ভিন্ন আলোকতরঙ্গে কাজ করবে। (হাবল বা নতুন চালু হওয়া নান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ ইনফ্রারেড তরঙ্গে দেখতে পারলেও, জেমস ওয়েব মূলত নিয়ার ও মিড-ইনফ্রারেড তরঙ্গ মাপার জন্য তৈরি করা হয়েছিল)। মূলত বহিরগ্রহের (এক্সোপ্ল্যানেট) উৎপত্তি, গ্যালাক্সির বিকাশ এবং বিশাল ব্ল্যাকহোলের বিবর্তন সম্পর্কে গভীর তথ্য উন্মোচন করাই হবে প্রাইমার মূল লক্ষ্য।
গ্রহের গঠন সংক্রান্ত গবেষণায় জড়িত জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মেরিডিথ ম্যাকগ্রেগর জানান, গ্রহ গঠনে পানির ভূমিকা চিহ্নিত করা এবং গ্রহের জন্মস্থানে গ্যাস, কার্বন ও অক্সিজেনের পরিমাণ মাপাই হবে প্রাইমার কাজ। তিনি আরও যোগ করেন, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এর জন্য যেসব বর্ণালী রেখা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন, তা কেবল ফার-ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যেই বিদ্যমান—যা জেমস ওয়েবের ক্ষমতার বাইরে।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড (ইউএমডি) এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ক্যালটেক) বিজ্ঞানীরা এই মিশনের অংশ হতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। ইউএমডি-র পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলবার্তো বোলাত্তো জানান, মানবাতির জ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিতে এমন একটি যুগান্তকারী সরঞ্জামের অংশ হতে পেরে তিনি রোমাঞ্চিত। অন্যদিকে ক্যালটেকের বিজ্ঞানী লি আর্মাস জানান, মহাজাগতিক সময়ে গ্যালাক্সির ভেতর গ্যাস ও অণুর শক্তিশালী প্রবাহ কীভাবে নতুন নক্ষত্র গঠন ও বিশালাকার ব্ল্যাকহোলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, তা বুঝতে প্রাইমা সাহায্য করবে।
'প্রোব এক্সপ্লোরার' সিরিজের প্রথম মিশন
উৎক্ষেপণ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে প্রাইমা প্রকল্পের বাজেট ধরা হয়েছে ১.২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি মার্কিন ডলার। এর তুলনায় ২০২১ সালে জেমস ওয়েব তৈরিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার কোটি (১০ বিলিয়ন) ডলার।
নাসার নতুন শ্রেণীর মহাকাশযান ‘প্রোব এক্সপ্লোরস’-এর আওতায় প্রথম মিশন হিসেবে স্থান পাচ্ছে প্রাইমা। এই শ্রেণীর মিশনগুলো বিশালাকার জেমস ওয়েবের মতো বড় ফ্ল্যাগশিপ মিশন এবং নাসার ছোট গবেষণাগুলোর মধ্যবর্তী স্তরে থাকবে। ১৯৫৮ সালে 'এক্সপ্লোরার ১' দিয়ে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক এক্সপ্লোরার প্রোগ্রামের অংশ এটি।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসের ২০২০ সালের এক জরিপ প্রতিবেদনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে নাসা ২০২৪ সালে দুটি ধারণার জন্য ৫০ লাখ ডলার করে অর্থায়ন করে। পরবর্তীতে বিস্তারিত পর্যালোচনার পর 'অ্যাডভান্সড এক্স-রে ইমেজিং স্যাটেলাইট'-কে পেছনে ফেলে 'প্রাইমা' মিশনকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় নাসা। এটি বাস্তবায়িত হলে নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল) আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থার সহায়তায় প্রাইমা মিশন পরিচালনা করবে।