২৬ বছর ধরে ঘাস-লতাপাতা খেয়েই জীবন, ৬৬ বছরেও সতেজ অমল কৃষ্ণ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

চারপাশে মানুষের ঘরবাড়ি। কারও উঠানে রান্নার ধোঁয়া উঠছে, কোথাও দুপুরের খাবারের আয়োজন। অথচ ৬৬ বছর বয়সী অমল কৃষ্ণ সুতারের জীবনে এসব যেন অন্য এক পৃথিবীর গল্প। নিজের বলে নেই কোনো ঘর। নেই স্ত্রী, সন্তান কিংবা স্থায়ী সংসার। এমনকি প্রতিদিন কী খাবেন, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই।

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সারেংকাঠি ইউনিয়নের এই মানুষটির জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় হলো—প্রায় ২৬ বছর ধরে তিনি প্রকৃতিতে জন্মানো নানা ধরনের ঘাস, লতাপাতা, জলজ উদ্ভিদ ও কচুরিপানা খেয়ে বেঁচে আছেন।

জঙ্গল, নদীর চর, খাল-বিল কিংবা জলাভূমি—যেখানেই খাবার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য কোনো উদ্ভিদ পান, সেটিই হয়ে যায় তার দিনের খাবার। কখনো কাঁচা, কখনো নিজের মতো করে প্রস্তুত করে এসব খান তিনি। প্রকৃতি যা দেয়, সেটাই তার খাদ্যতালিকা।

আর আশ্চর্যের বিষয়, স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এত দীর্ঘ সময় এমন জীবনযাপন করেও অমল কৃষ্ণকে এখনো শারীরিকভাবে বেশ সতেজ দেখায়।

অমল কৃষ্ণের জীবনযাত্রার এই অস্বাভাবিক অধ্যায়ের শুরুটা অবশ্য কোনো শখ বা পরীক্ষামূলক খাদ্যাভ্যাস থেকে নয়। শুরু হয়েছিল অভাবের তাড়নায়।

জানা যায়, ১৯৮১ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন অমল কৃষ্ণ। এরপর জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে তার দিন। প্রায় ২৬ বছর আগে তীব্র খাদ্যসংকটের সময় খাবারের সন্ধানে জঙ্গল ও জলাভূমিতে ঘুরতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ খাওয়া শুরু করেন তিনি।

প্রথমে প্রয়োজন ছিল খাবারের। পরে সেই খাবারই ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়।

অমল কৃষ্ণ বলেন, ‘প্রায় ২৬ বছর ধরে এসব খেয়ে আমি ভালো আছি। বিষাক্ত কোনো কিছু খাই না। অভাবের কারণে এসব খাওয়া শুরু করেছিলাম। পরে সেটাই অভ্যাস হয়ে গেছে। এখনো খেয়ে যাচ্ছি। আমার কোনো রোগ-বালাই নেই।’

অমল কৃষ্ণের কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যতালিকা নেই। সকালের নাশতা, দুপুরের ভাত কিংবা রাতের খাবার—তার জীবনে এমন নির্দিষ্ট রুটিন নেই।

কোনো দিন জঙ্গলে পাওয়া ঘাস বা লতাপাতা, কোনো দিন জলাভূমির উদ্ভিদ, আবার কোনো দিন কচুরিপানা—প্রকৃতিতে সেদিন যা পাওয়া যায়, তার ওপরই নির্ভর করে খাবারের ব্যবস্থা।

খাবারের সন্ধানে দিনের বড় একটি সময় তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়। কখনো বন-জঙ্গল, কখনো নদীর চর, আবার কখনো খাল-বিলের আশপাশে তাকে দেখা যায়।

স্থানীয়দের কাছে দৃশ্যটি এখন আর নতুন নয়। বরং বছরের পর বছর ধরে তারা অমল কৃষ্ণকে এভাবেই দেখে আসছেন।

স্থানীয় শিক্ষক অনুপ কুমার বলেন, ‘প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে অমলকে এভাবেই দেখে আসছি। জঙ্গল ও খাল-বিল থেকে খাবার সংগ্রহ করে খায়। এত বছর পরও তাকে বেশ সতেজ মনে হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা রিপনের ভাষায়, ‘এ ধরনের জীবনযাপন করা মানুষ এলাকায় খুবই বিরল। প্রায় ২৫-২৬ বছর ধরে তাকে একইভাবে দেখে আসছি।’

অমল কৃষ্ণের গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ হয়তো তার খাবারের অভ্যাস নয়; বরং তার নিঃসঙ্গ জীবন।

৬৬ বছর বয়সে এসে নিজের বলে একটি ঘরও নেই তার। নেই স্ত্রী, নেই সন্তান, নেই স্থায়ী সংসার। কখনো পরিচিতজনের বাড়িতে রাত কাটান, কখনো অন্যের ঘরে আশ্রয় নেন।

কখনো তাকে ইন্দুর হাট ফেরিঘাট এলাকায় একটি জরাজীর্ণ ঘরেও অবস্থান করতে দেখা যায়।

অর্থাৎ জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তার সামনে নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের প্রত্যেকের মতো তারও একটি ঘরের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সেই ঘরটিই তার জীবনে অধরা।

অমল কৃষ্ণের জীবনযাপন শুনলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা সম্ভব কীভাবে?

নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তার শরীরে উল্লেখযোগ্য কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের জীবনযাপন অত্যন্ত বিরল। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বন্য ও জলজ উদ্ভিদ খেয়ে একজন মানুষের টিকে থাকা অবশ্যই ব্যতিক্রমী। অমল কৃষ্ণকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বর্তমানে কোনো রোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’

তবে চিকিৎসকেরা কোনো রোগের প্রমাণ না পেলেও এর অর্থ এই নয় যে এমন খাদ্যাভ্যাস সবার জন্য নিরাপদ।

অমল কৃষ্ণ দীর্ঘদিন ধরে কিছু নির্দিষ্ট উদ্ভিদ খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু অপরিচিত বন্য উদ্ভিদ বা জলজ উদ্ভিদ খাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে।

কোনো উদ্ভিদ দেখতে নিরীহ হলেও তার মধ্যে বিষাক্ত উপাদান থাকতে পারে। আবার কোনো উদ্ভিদ কাঁচা খাওয়ার উপযোগী না হলেও রান্না বা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নিরাপদ হতে পারে। ফলে শুধু দীর্ঘদিন খেয়ে কোনো সমস্যা হয়নি—এমন অভিজ্ঞতা থেকে অন্যদের একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা নিরাপদ নয়।

অমল কৃষ্ণ নিজেও বলেছেন, তিনি বিষাক্ত কিছু খান না। কিন্তু কোন উদ্ভিদ বিষাক্ত আর কোনটি নিরাপদ—এটি নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অমল কৃষ্ণের জীবন তাই শুধু ‘ঘাস-লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকা’ এক বিস্ময়কর গল্প নয়। এর ভেতরে আছে দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট, একাকিত্ব এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প।

২৬ বছর আগে যে অভাব তাকে জঙ্গল ও জলাভূমির উদ্ভিদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই তার জীবনযাত্রার অংশ হয়ে গেছে।

৬৬ বছর বয়সেও তিনি ঘুরে বেড়ান খাবারের সন্ধানে। কখনো প্রকৃতি তাকে খাবার দেয়, কখনো হয়তো দিতে চায় না। তবু জীবন থেমে থাকে না।

ওয়াইএ
আরও পড়ুন