চীনের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে 'কষ্ট পাওয়ার জন্য অর্থ ব্যয়' বা 'ভয় কেনার জন্য খরচ করা'-র মতো বাক্যাংশগুলো এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা 'ডার্ক ট্যুরিজম' বা অন্ধকার পর্যটনের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের অংশ।
কৃত্রিম দুর্যোগের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় এমন এক প্রতিষ্ঠান হাংঝৌয়ের 'লিউশিং বেজ' ইন্টারনেট দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিকূল ও চরম ভাবাপন্ন পরিবেশগুলোতে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
২০২৪ সালে চালু হওয়া ২ লাখ বর্গমিটারের এই বিশাল কেন্দ্রে তারা টাইফুন এবং ভূমি-ধসের (পাহাড়ি ধস) মতো চরম পরিস্থিতি কৃত্রিমভাবে তৈরি করেন, যা অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ার রোমাঞ্চকর অনুভূতি দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার ওয়াং কুয়াংহান বলেন, 'আমি এটি অস্বীকার করছি না যে অনেকেই রোমাঞ্চের খোঁজে এখানে আসেন। তারা দেখতে চান এই জায়গাটি কেমন, একটি আসল টাইফুন এবং মুষলধারে বৃষ্টির তীব্রতা কেমন লাগে এবং তারা নিজেরা এটি সহ্য করতে পারেন কি না।আমাদের একক গ্রাহকদের বেশিরভাগেরই বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।'
প্রতিষ্ঠানটি আগামী তিন বছরের মধ্যে চীনজুড়ে আরও পাঁচটি কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ভূমিকম্প এবং অগ্নিকাণ্ডের কৃত্রিম পরিস্থিতি তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এই ধরনের আয়োজন কেবল ব্যক্তিগত কোম্পানিগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিংয়ের হেইদিয়ান পাবলিক সেফটি মিউজিয়ামে ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ও সাউন্ড ইফেক্ট সমৃদ্ধ ৪ডি থিয়েটার ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের কৃত্রিম ভূমিকম্প, সুনামি ও অগ্নিকাণ্ডের অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়।
গত বছর চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গোয়াংঝু জরুরি অবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি পাঁচতলা কেন্দ্র চালু করেছে। সেখানকার ভূমিকম্প সিমুলেটর বা কৃত্রিম যন্ত্রটি ৭.২ মাত্রার শক্তিশালী কম্পন তৈরি করতে সক্ষম।
চীনে বৈরী আবহাওয়া এখন ক্রমশ সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে চীন ইতিহাস রেকর্ড করা শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার দিন প্রত্যক্ষ করেছে এবং ১০টি টাইফুনের আঘাত সহ্য করেছে, যা বাৎসরিক গড় সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব দুর্যোগের কারণে দেশজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
২০২৪ সালে স্থানীয় সরকারগুলোকে সরাসরি অভিজ্ঞতামূলক দুর্যোগ শিক্ষার প্রচার করার নির্দেশ দেওয়া হয়; যেখানে প্রকৃত সংকটে কীভাবে ব্যবস্থা নিতে হয় তা মানুষকে শেখাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কেন্দ্র, জাদুঘর ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কৃত্রিম দুর্যোগের মহড়া ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
'নতুন প্রজন্মের পর্যটক'
হংকংয়ের চাইনিজ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্টের পরিচালক রবার্ট লি বলেন, 'চীনের নতুন প্রজন্মের পর্যটকরা কেবল বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার চেয়ে কোনো জায়গার পরিস্থিতি সরাসরি অনুভব করতে বেশি আগ্রহী।'
তবে কিছু পর্যটক এই দুটি পদ্ধতির মিশ্রণ ঘটানোর পথ খুঁজে পেয়েছেন। তারা টাইফুনের কৃত্রিম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় ডুবে থাকার বদলে ধ্বংস ও মৃত্যুর আসল স্থানগুলোতে ভ্রমণ করছেন।
২০০৮ সালের মে মাসে ৮.০ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের বিভিন্ন শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, যাতে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান।
সিচুয়ানের ৩০ বছর বয়সী লেখিকা অ্যালিস ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর অন্যতম 'বেইচুয়ান' ঘুরে দেখেন, যার ধ্বংসাবশেষ সরকার সংরক্ষণ করে রেখেছে। সাধারণ মানুষের দেখার জন্য ভেঙে পড়া ভবনগুলোকে লোহার বিম দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি সেখানে গিয়ে এমন স্থানগুলোও প্রত্যক্ষ করেছেন যেখানে স্কুল ভবন ধসে পড়ে ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছে অবস্থিত ইংসুয়ে শহরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষের মাঝখানে একটি ভাঙা ঘড়ি ২টা ২৮ মিনিটে থমকে রয়েছে—ঠিক যে মুহূর্তে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
অ্যালিস বলেন, 'প্রকৃতির বিধ্বংসী ক্ষমতা দেখে এবং কত শত শিশু-শিক্ষার্থী যে সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে পালাতে পারেনি তা ভেবে আমি শিউরে উঠেছিলাম।' ট্র্যাজেডি বা ঐতিহাসিক করুণ ঘটনাগুলো নিয়ে নিজের ভ্রমণের গল্প বিশদভাবে তুলে ধরতে একটি চীনা ভাষার সাবস্ট্যাক অ্যাকাউন্ট খোলার পরিকল্পনা করছেন তিনি। অ্যালিস আরও বলেন, 'সবকিছু এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল যে পুরোনো শহরটিতে এখন আর কেউ বাস করে না বলে এটি একেবারে ভুতুড়ে নগরে পরিণত হয়েছে।'
অ্যালিসের বিশ্বাস, 'ডার্ক ট্যুরিজম' কোনো দেশকে তার অতীতের তিক্ত ইতিহাসের সাথে সমঝে চলতে বা শান্ত হতে সাহায্য করে—যদিও সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ঠিক কোন স্মৃতিটুকু ইতিহাসে মনে রাখা হবে।
একজন পর্যটক নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, একটি কৃত্রিম বন্যার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার সময়, শত শত টন পানি যখন লোকজনকে ভাসিয়ে নিয়ে নিরাপত্তার প্রাচীরের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন মুহূর্তের জন্য তার মাথা একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। পানির প্রবল স্রোত যখন আঘাত হানে, তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে এটি একটি কৃত্রিম মহড়া।
তিনি বলেন, 'একটি বিষয় আমি শিখেছি, তা হলো—বন্যার সময় কীভাবে শান্ত থাকতে হয় এবং নিজেকে রক্ষা করতে হয়। নিরাপদে থাকার জন্য শরীরের অবস্থান কীভাবে রাখতে হয়, তাও আমি আয়ত্ত করেছি। কোনো বই বা কোনো বিদ্যালয় আমাকে এভাবে শিক্ষা দিতে পারত না।'
সম্প্রতি ট্যুর গাইড সামান্থা ওয়াং নানজিং গণহত্যা স্মৃতিসৌধে চীনা পর্যটকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখেছেন। ১৯৩৭ সালে জাপানি ইমপেরিয়াল আর্মি (সম্রাটের বাহিনী) নানজিং দখল করে নেয়। চীনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই গণ হত্যায় প্রায় ৩ লাখ বেসামরিক নাগরিক ও সেনা সদস্য প্রাণ হারান।
অন্যদিকে জাপানের সরকারি অবস্থান—তারা বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও নিহতের সঠিক সংখ্যা 'নির্ধারণ করা কঠিন' বলে মনে করে। স্মৃতিসৌধে প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না, তবে পর্যটকদের আগে থেকেই অনলাইনে বুকিং করতে হয়।
স্থানীয় সরকার প্রতিদিনের জন্য ২৫ হাজার স্থান নির্দিষ্ট বা সংরক্ষিত রাখে। ওয়াং জানান, আগস্ট মাসে জাদুঘরটির প্রবেশের টিকিট প্রায়শই আগাম বিক্রি হয়ে শেষ হয়ে যায়।
ওয়াং বলেন, 'চীনে এ ধরনের আরও অনেক ট্র্যাজিক বা হৃদয়বিদারক স্থান রয়েছে এবং আমি দেখছি এসব বিষয়ে জানতে মানুষের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। এটি একটি নতুন ধারা বা ট্রেন্ড।'
স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিহতদের ছবি টাঙানো রয়েছে। ওয়াং বলেন, 'দর্শনার্থীরা যখন সেই ছবিগুলো দেখেন, যখন নিহত শিশুদের ছবিগুলো দেখেন, তখন তারা গভীরভাবে ব্যথিত হন। তবে পরিদর্শনের পর তারা স্বস্তি অনুভব করেন এবং চীনকে আরও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করার জন্য অনুপ্রাণিত হন।'