চাঁদে আবারও নভোচারী পাঠানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৭ সালে আর্টেমিস-৩ মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এই মিশনে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে মহাকাশযানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, নভোচারীদের নিরাপদে অবস্থান এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস-৩ মিশনে ওরিয়ন মহাকাশযানে করে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে যাবেন নাসার নভোচারী র্যান্ডি ব্রেসনিক, ফ্র্যাঙ্ক রুবিও ও আন্দ্রে ডগলাস এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) নভোচারী লুকা পারমিতানো। প্রায় ১৪ দিনের এই মিশনে মহাকাশযানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, নভোচারীদের অবস্থানের পরিবেশ এবং পরিচালনাপদ্ধতি পরীক্ষা করা হবে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি এলাকায় ভবিষ্যতে নভোচারীদের অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কার্যক্রম যাচাই করাই এ মিশনের প্রধান লক্ষ্য। নাসার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে চাঁদে নভোচারী অবতরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হবে।
নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির ব্যবস্থাপক জেরেমি পারসনস বলেন, নভোচারীদের আবার চাঁদে পাঠানোর আগে ঝুঁকি কমানোর জন্য পৃথিবীর কক্ষপথে মিশনের প্রতিটি কার্যক্রম সাজানো হয়েছে। তিনটি ভিন্ন রকেটে তিনটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করে সেগুলোকে একসঙ্গে পরিচালনার পরীক্ষা করবে নাসা। সংস্থাটির ইতিহাসে এ ধরনের উদ্যোগ হবে নতুন অভিজ্ঞতা। পরীক্ষায় পাওয়া শিক্ষা ২০২৮ সালে চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।
প্রথম ধাপে পরীক্ষা হবে ব্লু অরিজিনের চন্দ্রযানের
আগের আর্টেমিস মিশনগুলোতে নাসার এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে। তবে আর্টেমিস-৩ মিশনে তিনটি আলাদা রকেটে তিনটি মহাকাশযান উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথমে মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ব্লু অরিজিন তাদের ‘ব্লু মুন মার্ক ২’ চন্দ্রযানের পরীক্ষামূলক সংস্করণ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে পাঠাবে। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭৩ মাইল বা ৪৩৯ কিলোমিটার উচ্চতায় বৃত্তাকার কক্ষপথে অবস্থান করবে। মহাকাশযানটি সেখানে সর্বোচ্চ ৩০ দিন থাকতে পারবে। ফলে পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি ও সময়সূচি সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
পরীক্ষামূলক যানটি কক্ষপথে পৌঁছানোর পর সেটির কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে। এরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এসএলএস রকেটের মাধ্যমে ওরিয়ন মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা হবে।
উৎক্ষেপণের পর ওরিয়ন প্রথমে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রবেশ করবে। পরে নিজস্ব সার্ভিস মডিউলের সাহায্যে বিভিন্ন কক্ষপথ পরিবর্তনের কৌশল প্রয়োগ করে প্রায় ৩৪৫ মাইল বা ৫৫৫ কিলোমিটার উচ্চতার বৃত্তাকার কক্ষপথে যাবে। এরপর ধীরে ধীরে ব্লু অরিজিনের পরীক্ষামূলক চন্দ্রযানের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
মিশনের প্রথম দুই দিন নভোচারীরা ওরিয়নের বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা করবেন এবং অন্য মহাকাশযানের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নেবেন। এরপর শুরু হবে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—ব্লু মুনের সঙ্গে ওরিয়নের সংযোগ স্থাপন।
এ পরীক্ষার মাধ্যমে নাসা প্রথমবারের মতো বাস্তব মহাকাশ পরিবেশে ওরিয়নের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের তৈরি চন্দ্রযানের কার্যক্রম যাচাই করার সুযোগ পাবে। প্রকৌশলীরা দুই মহাকাশযানের সফটওয়্যার, দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা, যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং পরিচালনাপদ্ধতি পরীক্ষা করবেন। পাশাপাশি একাধিক দল ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হবে।
দুই মহাকাশযান যুক্ত হওয়ার পর নভোচারীরা প্রায় দুই দিন ব্লু মুনের পরীক্ষামূলক সংস্করণে বিভিন্ন পরীক্ষা চালাবেন। তারা এর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে কেবিনের পরিবেশ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার প্রযুক্তি পরীক্ষা করবেন। কেবিনের বায়ুমণ্ডল ও চাপ ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তাও যাচাই করা হবে।
ব্লু মুনের পরীক্ষামূলক যানে ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, সফটওয়্যার, উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি, নভোচারীদের কেবিন এবং জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার প্রযুক্তি রয়েছে। কক্ষপথে এসব ব্যবস্থা একসঙ্গে কীভাবে কাজ করে, তা সরাসরি যাচাই করা যাবে।
এরপর পরীক্ষা হবে স্পেসএক্সের স্টারশিপের সঙ্গে সংযোগ
ব্লু অরিজিনের চন্দ্রযানের সঙ্গে পরীক্ষা শেষ হলে ওরিয়ন সেটি থেকে বিচ্ছিন্ন হবে এবং মিশনের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য অবস্থান পরিবর্তন করবে।
এ পর্যায়ে স্পেসএক্স তাদের ‘স্টারশিপ ভার্সন ৩’-এর একটি পরীক্ষামূলক সংস্করণ ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপণ করবে। ব্লু মুনের তুলনায় স্টারশিপের কক্ষপথে অবস্থানের পরিকল্পিত সময় কম হওয়ায় মিশনের পরবর্তী পর্যায়ে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। স্টারশিপ পৃথিবী থেকে প্রায় ২০৬ নটিক্যাল মাইল বা ৩৮২ কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে প্রবেশ করবে। যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এই কক্ষপথ নির্ধারণ করা হবে।
এরপর ওরিয়ন স্টারশিপের কাছে গিয়ে সেটির সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এই পরীক্ষা প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। তবে নভোচারীরা স্টারশিপের ভেতরে প্রবেশ করবেন না। বরং দুটি মহাকাশযান যুক্ত অবস্থায় কীভাবে কাজ করে, সেটিই হবে পরীক্ষার মূল বিষয়।
নাসা ও স্পেসএক্স মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, সমন্বিত সফটওয়্যার এবং সংযোগ স্থাপন ও বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়কার কার্যক্রম মূল্যায়ন করবে।
ব্লু মুন ও স্টারশিপের সংযোগব্যবস্থার নকশাও এক নয়। ব্লু মুনের নভোচারীদের কেবিনের পাশে থাকা সংযোগপথে ওরিয়ন যুক্ত হবে। অন্যদিকে স্টারশিপের সামনের অংশে থাকা সংযোগব্যবস্থার সঙ্গে ওরিয়নকে যুক্ত করতে হবে। একই মিশনে দুই ধরনের সংযোগপ্রযুক্তি পরীক্ষা করে ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে নাসা।
চাঁদে ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য আরও পরীক্ষা
স্টারশিপের সঙ্গে সংযোগ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও ওরিয়ন ও নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে সর্বোচ্চ আরও পাঁচ দিন থাকতে পারবেন। এ সময়ে ভবিষ্যৎ আর্টেমিস মিশনের জন্য আরও কয়েকটি পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে নাসার।
এর মধ্যে থাকবে নভোচারীদের সুরক্ষাব্যবস্থার পোশাক পরীক্ষা, মহাকাশযানের সংযোগ শনাক্তকারী সেন্সর যাচাই, শব্দ ও তাপমাত্রা পরিমাপ এবং নভোচারীদের কাজের পরিবেশ ও শারীরিক সক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট বিষয় মূল্যায়ন। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন পরীক্ষাও চালানো হবে।
আর্টেমিস-২ মিশনে পরিচালিত গবেষণার ধারাবাহিকতায় নাসার কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে এমন একটি পরীক্ষাও রয়েছে, যেখানে পৃথিবীর মিশন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব না হলে নভোচারীরা কীভাবে নিজেদের স্বাস্থ্যের অবস্থা মূল্যায়ন করতে পারবেন, তা যাচাই করা হবে। চাঁদের পৃষ্ঠে দীর্ঘ সময় অবস্থান কিংবা পৃথিবী থেকে আরও দূরের অভিযানের ক্ষেত্রে এ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মিশনে কোষজীববিজ্ঞান-সংক্রান্ত একটি পরীক্ষাও চালানো হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাঁদ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা করা হবে। নমুনাগুলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর কীভাবে গ্রহণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ করা হবে, তা মূল্যায়ন করবেন গবেষকেরা। ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে নমুনা দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে ওরিয়নের পরিবেশও পরীক্ষা করা হবে।
এ ছাড়া মহাকাশযান থেকে পৃথিবী ও সূর্য পর্যবেক্ষণ করবেন নভোচারীরা। এর মাধ্যমে তাদের পর্যবেক্ষণ দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি মহাকাশ থেকে পাওয়া তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে। ওরিয়নে উদ্ভিদের বীজও নেওয়া হবে, যা মিশন শেষে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মিশনের সময়সূচিতে কিছুটা নমনীয়তা রাখা হয়েছে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত পরীক্ষার সুযোগও থাকবে।
সব কার্যক্রম শেষ হলে ওরিয়ন পৃথিবীতে ফেরার প্রস্তুতি নেবে। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগে নভোচারীরা কেবিন প্রস্তুত করবেন। এরপর ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মাধ্যমে মিশন শেষ হবে। নাসার কর্মী ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নভোচারী এবং মহাকাশযান উদ্ধারে কাজ করবে।
চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি
আর্টেমিস-৩ মিশনের মূল উদ্দেশ্য হলো নভোচারীদের আবার চাঁদের পৃষ্ঠে পাঠানোর আগে প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত ঝুঁকি কমানো। একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে জটিল মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে নাসা।
মিশন থেকে মহাকাশযানের পারস্পরিক সামঞ্জস্য, যোগাযোগব্যবস্থা, মিশন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয়, নভোচারীদের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে চাঁদে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিচালনাপদ্ধতি আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে সহায়তা করবে।
নাসার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় চাঁদের দক্ষিণ মেরুর আশপাশে একের পর এক জটিল অভিযান পরিচালনা এবং সেখানে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
চাঁদে মানুষের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে প্রথম মানববাহী মঙ্গল অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও এগিয়ে নিতে চায় নাসা।
সূত্র: নাসা