বিএনপির ভরসা রাজনৈতিক আশ্রয়

তারেক রহমানকে দেশে ফেরাতে সরকারের উদ্যোগ

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে দেশ ছাড়েন। তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলার মধ্যে ২১টি মামলা চলমান। এসব মামলার প্রায় প্রত্যেকটিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপন, গ্রেনেড হামলা মামলায় লন্ডনে থাকা তারেক রহমান এ পর্যন্ত যথাক্রমে ৭ বছর, ১০ বছর এবং যাবজ্জীবন দণ্ড পেয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ড হচ্ছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে। এ রায়ে তাকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন সাত বছর সাজা পেয়েছেন মানি লন্ডারিংয়ের মামলায়। এছাড়া তার মায়ের সঙ্গে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ড হয়েছে ১০ বছরের।

তারেক রহমান চিকিৎসার জন্য উচ্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে ২০০৮ সালে লন্ডনে যান। পরে তার জামিন বাতিল করে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন দেওয়া হয়। তিনি না আসায় পলাতক হিসেবে রায় ঘোষণা করা হয় বিভিন্ন মামলায়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মামলায়ও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা আছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে অবস্থান করছেন তারেক রহমান। যদিও ২০১২ সালে তিনি ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। এক বছরের মধ্যেই তার এই আবেদন মঞ্জুর করে দেশটির সরকার। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকরের চেষ্টা চলছে বলেও বিভিন্ন সময় জানিয়েছে সরকার। এর মধ্যে গত রোববার এক মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এরপর থেকে এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে চলছে আলোচনা।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর তারেক রহমানকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই মনে করেন, সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা বা চিন্তা না থাকলে সরকারপ্রধান হঠাৎ করে এমন বক্তব্য দিতেন না। এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, তারেক রহমান শাস্তিপ্রাপ্ত আসামি। আমাদের সরকার যে কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামির শাস্তি কার্যকর করতে চায়। তারেক রহমানকে উপযুক্ত সময়ে সরকার তার শাস্তি কার্যকর করার জন্য যা যা করার সেটা করবে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যর পরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান খবর সংযোগকে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতাদের গ্রেপ্তার করে এবং শাস্তি দিয়ে কিংবা মামলা দিয়ে ঠেকানো যায় না। এটি বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। তারেক রহমানকে সরকারের ফিরিয়ে আনতে হবে না। গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলন সফল করেই ‘বীরের বেশে’ দেশে আসবেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা সারা দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এতে ভয় পেয়েই সরকার বিচলিত। তারা একের পর এক অপকৌশলের মাধ্যমে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে বিতর্কিত করতে চাইছে। কিন্তু এসবে কোনো কাজ হবে না।

বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, তাকে দেশে ফেরত আনার আইনি কোনো পন্থা সরকারের কাছে নেই। ‘তারেক রহমানকে দেশে ফেরানোর কথা তো সরকার অনেকদিন ধরেই বলছে। কিন্তু তাকে আনার কোনো বিধান আইনে নেই। এরপরও তারা কীসের ভিত্তিতে বলছে, তা বুঝতে পারছি না। এর আগে আইনমন্ত্রীও বলেছেন যে, আমরা খুব সহসাই তাকে দেশে এনে সাজা কার্যকর করব। বলা যায় বাস্তবে তা সম্ভব নয়। কারণ তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন।

তারেক রহমানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ জয়নাল আবেদিন মেজবাহ বলেন, ‘রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সরকার ও তাদের সমর্থকরা একের পর এক মামলা দিয়ে যাচ্ছে। যদিও এসব মামলার কোনও ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘কাউকে বিদেশ থেকে আনতে হলে সেই দেশের সঙ্গে চুক্তি থাকতে হয়। সেটা আছে কি না, তা উনারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমি মনে করি, তারেক রহমানকে কোনোভাবেই আনা সম্ভব নয়। তিনি স্বেচ্ছায় যদি দেশে না আসেন, তাহলে ব্রিটিশ সরকার কীভাবে পাঠাবে? সে বিষয়ে আইন-কানুন আছে বলে তো আমার মনে হয় না। আর যদি ব্রিটিশ সরকারের আইনে থাকে, তাহলে পাঠাতে পারে।

খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপি আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই এসব মামলা দায়ের করা হয়। সরকার তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে হবে না। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসলে তারেক রহমান নিজেই ফিরে আসবেন।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা কয়েকটি মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে যেসব কথা বলা হয়, সেগুলো ঠিক নয়। এছাড়া অন্য মামলাগুলো আইন অনুযায়ী নিজস্ব গতিতে চলছে। কয়েকটি মামলায় সাজা হয়েছে। কিছু মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

যেসব মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন তারেক রহমান 

১. অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের মামলায় তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে ৯ বছর ও জোবাইদাকে ৩ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ০২ আগস্ট ঢাকার সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান এ রায় দেন।

২. ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের একটি মামলায় ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত তারেক রহমানকে খালাস দেন। ওই মামলায় তারেকের বন্ধু ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারেক রহমানকে খালাস দেওয়ার রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হাইকোর্টে আপিল করেন। ওই আপিল শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ২১ জুলাই বিচারিক আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি ২০ কোটি টাকা জরিমানা করেন।

৩. ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় তারেকের দণ্ড হয় ১০ বছর। এই মামলায় সাজা হয় তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও। বিচারিক আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিলেও রাষ্ট্রের আপিলে উচ্চ আদালত সাজা দ্বিগুণ করেছেন।

৪. ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়। গ্রেনেড হামলার ঘটনা থেকে উদ্ভূত হত্যা মামলায় তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৫. একই দিনে ওই ঘটনা থেকে উদ্ভূত বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায়ও রায় দেওয়া হয়। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তারেক রহমানকে ২০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

৬. ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে নড়াইলের একটি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করায় নড়াইলে তারেকের বিরুদ্ধে মানহানির এই মামলা করেছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘বিভিন্ন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তারেক রহমানকে সাজা দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ডিসির মাধ্যমে সরকারের কাছে রায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকিটা সরকারের কাজ। তবে যেহেতু যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের এক্সট্রাডিশন ট্রিটি (প্রত্যর্পণ চুক্তি) নেই, সেহেতু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোরালো ভূমিকা নিলে একটা ফল পাওয়া যেতে পারে। শুধু কাগজে রায় পেয়ে লাভ কী, যদি না সেটি এক্সিকিউট করতে পারি? এখানে সরকারের আরও আগেই জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার ছিল। এখন সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কত দ্রুত ব্রিটিশ সরকারের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে পারছে সেটার ওপর নির্ভর করবে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্রিটেনে ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে’ আছেন। তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেননি। রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র বিভাগে স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই তিনি তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে তারেক রহমানের জীবন নিরাপদ নয়। তাই বিশ্বের অসংখ্য বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতোই সাময়িকভাবে বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং সংগত কারণেই তা পেয়েছেন।

ইন্টারপোলের মাধ্যমে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করতে হলে যা যা করতে হবে

বর্তমানে তারেক রহমান যেহেতু রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনে বসবাস করছেন, তাই তিনি বাংলাদেশ পাসপোর্ট জমা দিয়ে বৃটিশ পাসপোর্ট গ্রহন করেছেন। তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে প্রথমে বাংলাদেশ সরকারকে বৃটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করতে হবে। বৃটেনর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ খতিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলে বৃটিশ পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এবং তার বিচার প্রক্রিয়া তখন বৃটেনে শুরু হবে। বাংলাদেশ সরকার বৃটেনের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি করে বাংলাদেশে তারেক রহমানকে ফেরত আনতে আবেদন করতে পারবে। কিন্তু বৃটেনে যেহেতু মৃত্যুদণ্ড আইন কার্যকর নয়, তাই বাংলাদেশ সরকারকে বৃটেনের কাছে এই মর্মে বন্ড দিতে হবে যে, যদি তারেক রহমান বাংলাদেশে ফেরত যায়, তাহলে তাকে কোনো বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না। কেবল তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করতে পারবে।

এছাড়া তারেক রহমান নিজে যদি আইনি লড়াইয়ের জন্য বাংলাদেশে আসেন, তাহলে তাকে বৃটিশ রাজনৈতিক আশ্রয় ত্যাগ করে নতুন বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিতে হবে। সেক্ষেত্র বৃটেনের বাংলাদেশে দূতাবাসের মাধ্যমে তাকে নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারেক রহমান কোন পন্থা অবলম্বন করবেন তা তার দল বিএনপি ও তার আইনজীবীরা ঠিক করবেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।