ফুটবল বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ইতিহাস

১৯৩০ সালের উরুগুয়ে থেকে ২০২৬-এর মেগা আসর

ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, কোটি কোটি মানুষের কাছে এটি এক চরম আবেগ। আর এই আবেগের সর্বোচ্চ মঞ্চ হলো ‘ফিফা বিশ্বকাপ’ (FIFA World Cup)। ১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দেশ নিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। 

শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়দের পায়ের জাদু, রোমাঞ্চকর জয় আর ট্র্যাজেডির গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস।

চলুন জেনে নেওয়া যাক উরুগুয়ে থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলার আদ্যোপান্ত।

বিশ্বকাপের সূচনা: অলিম্পিক ছেড়ে যেভাবে জন্ম নিলো বিশ্বমঞ্চ

১৯২০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত অলিম্পিক গেমসকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর মনে করা হতো। তবে ফুটবলে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া লাগায় অলিম্পিকের অপেশাদার নীতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসেন ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুল রিমে। তার একক প্রচেষ্টায় ১৯৩০ সালে প্রথম স্বাধীন ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়।

প্রথম আয়োজক ও চ্যাম্পিয়ন: ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ এককভাবে আয়োজন করে উরুগুয়ে এবং ঘরের মাঠে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে তারা।

ভ্রমণের কঠিন চ্যালেঞ্জ: সে সময় যাতায়াত ব্যবস্থা আজকের মতো উন্নত ছিল না। মাত্র ১৩টি দল এই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়, যার মধ্যে ইউরোপীয় দলগুলোকে দুই সপ্তাহের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রা করে উরুগুয়ে পৌঁছাতে হয়েছিল।

ইতিহাসের প্রথম গোল: বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলটি করার কৃতিত্ব অর্জন করেন ফ্রান্সের ফুটবলার লুসিয়েন লরেন্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া ও মারাকানার ট্র্যাজেডি (১৯৩৪-১৯৫০)

ইতালি ১৯৩৪ এবং ১৯৩৮ সালে পরপর দুবার বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে টানা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়ে। তবে এরপরই বিশ্বজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালের নির্ধারিত দুটি বিশ্বকাপ বাতিল করতে বাধ্য হয় ফিফা।

১২ বছরের দীর্ঘ বিরতি শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আবার বিশ্বকাপ মাঠে ফেরে। এই আসরটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্য বিখ্যাত, যা ‘মারাকানাজো’ (Maracanazo) নামে পরিচিত। মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় ২ লাখ স্বাগতিক দর্শকের সামনে ফেভারিট ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ছিনিয়ে নেয় উরুগুয়ে।

সোনালী অধ্যায়: পেলে-ম্যারাডোনার জাদুকরী যুগ (১৯৫৮-১৯৮৬)

এই যুগটি ফুটবলকে বিশ্বের জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায় এবং বিশ্ববাসী পরিচয় পায় সর্বকালের সেরা কিছু ফুটবল কিংবদন্তির সাথে।

১. পেলে এবং ব্রাজিলের সাম্বা জাদু (১৯৫৮-১৯৭০)

১৯৫৮ সালে সুইডেনের মাটিতে মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ ফুটবল বিশ্বে ঝড় তোলেন, তিনি আর কেউ নন—ফুটবল সম্রাট পেলে। তাঁর জাদুকরী নৈপুণ্যে ব্রাজিল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল ফুটবল বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭০ সালের ব্রাজিল দলটিকে আজও ইতিহাসের সেরা আন্তর্জাতিক দল হিসেবে গণ্য করা হয়।

২. টোটাল ফুটবলের উত্থান (১৯৭৪-১৯৭৮)

১৯৭০-এর দশকে ফুটবলে নতুন রণকৌশলের জন্ম হয়। ইয়োহান ক্রুইফ এবং নেদারল্যান্ডস দল "টোটাল ফুটবল" (Total Football) দিয়ে বিশ্বকে মুগ্ধ করলেও, ঘরের মাঠে ট্রফি জেতে যথাক্রমে পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪) ও আর্জেন্টিনা (১৯৭৮)।

৩. ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্য ও ‘হ্যান্ড অব গড’ (১৯৮৬)

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপটি ছিল পুরোপুরি ফুটবলের বরপুত্র দিয়েগো ম্যারাডোনা-র। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি প্রথমে হাত দিয়ে বিতর্কিত "হ্যান্ড অব গড" (Hand of God) গোলটি করেন। এর ঠিক চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে শতাব্দীর সেরা গোল ("Goal of the Century") করে আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন ম্যারাডোনা।

আধুনিক যুগের সম্প্রসারণ: ৩২ দলের বিশ্বযুদ্ধ (১৯৯৪-২০১৮)

ফুটবলের বাণিজ্যিক পরিধি এবং দর্শকপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে ফিফা বিশ্বকাপের পরিধিও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৪: প্রথমবারের মতো উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়, যা দর্শক উপস্থিতির সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। ফাইনালে ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ব্রাজিল চতুর্থবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়।

ফ্রান্স ১৯৯৮: এই আসর থেকে দলের সংখ্যা ২৪টি থেকে বাড়িয়ে ৩২টি করা হয়। জিনেদিন জিদানের দুর্দান্ত হেডে ফ্রান্স তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে।

রোহিঙ্গা এশিয়া ২০০২: ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরে প্রথমবার যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। এই আসরে রোনালদো নাজারিওর নৈপুণ্যে ব্রাজিল তাদের রেকর্ড গড়া পঞ্চম (৫ম) শিরোপা জেতে।

ইউরোপীয় আধিপত্য (২০০৬-২০১৮): এরপর টানা চারটি বিশ্বকাপে ইউরোপের দলগুলো রাজত্ব করে। যথাক্রমে ইতালি (২০০৬), স্পেন (২০১০), জার্মানি (২০১৪) এবং ফ্রান্স (২০১৮) সোনালী ট্রফি নিজেদের ঘরে তোলে।

সমসাময়িক ফুটবল এবং আগামী দিনের মেগা বিশ্বকাপ (২০২২-বর্তমান)

কাতার ২০২২: মেসির অধরা স্বপ্নপূরণ

কয়েক দশকের ঐতিহ্য ভেঙে মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র গরম এড়াতে ২০২২ সালের বিশ্বকাপটি প্রথমবারের মতো নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে (শীতকালে) অনুষ্ঠিত হয়। 

কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালকে ফুটবল ইতিহাসের সেরা ফাইনাল বলা হয়। আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের মধ্যকার ৩-৩ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। 

অবশেষে ফরাসিদের হারিয়ে লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের একমাত্র অধরা ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে তৃতীয় তারকা যোগ করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ: ৪৮ দলের মহাসমর

বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রা এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যৌথভাবে তিনটি দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে: কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র। এই টুর্নামেন্টটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রসারণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যেখানে ৩২টি দলের পরিবর্তে এবার ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে। এর ফলে বিশ্বমঞ্চে ট্রফি জয়ের লড়াই আরও জমজমাট ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠবে।

এক নজরে বিশ্বকাপের শীর্ষ শিরোপাজয়ী দেশসমূহ:

ব্রাজিল: ৫ বার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪, ২০০২)

জার্মানি: ৪ বার (১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০, ২০১৪)

ইতালি: ৪ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২, ০০৬)

আর্জেন্টিনা: ৩ বার (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২)

ফ্রান্স: ২ বার (১৯৯৮, ২০১৮)

উরুগুয়ে: ২ বার (১৯Check০, ১৯৫০)

ইংল্যান্ড: ১ বার (১৯৬৬)

স্পেন: ১ বার (২০১০)