মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের মাত্র চার দিনের ব্যবধানে এবার রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে পৌঁছেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এটি চীনের মাটিতে রুশ প্রেসিডেন্টের ২৫তম সফর।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের শীর্ষ দুই শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আতিথেয়তা দিয়ে চীন বিশ্বরাজনীতিতে নিজের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও আত্মবিশ্বাসের জানান দিল।
বিশেষ করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ভ্লাদিমির পুতিনের গভীর সম্পর্ক এই সফরের মাধ্যমে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দুই রাষ্ট্রপ্রধান এ পর্যন্ত ৪০ বারেরও বেশি মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হয়েছেন, যা পশ্চিমা কোনো নেতার সাথে জিনপিংয়ের সাক্ষাতের চেয়ে অনেক বেশি।
ওয়াশিংটনকে বেইজিংয়ের প্রচ্ছন্ন বার্তা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের পরপরই পুতিনকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানিয়ে শি জিনপিং মূলত ওয়াশিংটনকে একটি শক্ত বার্তা দিতে চাইলেন।
বার্তাটি হলো—বিশ্বমঞ্চে চীন একা নয়, বরং বেইজিংয়ের পাশে আরও অনেক শক্তিশালী অংশীদার রয়েছে। ফলে চাইলেই চীনকে সহজে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিচ্ছিন্ন বা কোণঠাসা করা যাবে না।
পুতিনের অভ্যন্তরীণ সংকট ও চীনের ওপর নির্ভরতা
ভ্লাদিমির পুতিন এমন এক সময়ে এই সফরে এলেন, যখন তিনি তার দীর্ঘ শাসনকালের অন্যতম কঠিন সময় পার করছেন।
রণক্ষেত্রের স্থবিরতা: ইউক্রেনীয় রণক্ষেত্রে চলতি বছরে রাশিয়ার বড় কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে পুতিনের ‘লৌহমানব’ ভাবমূর্তি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ: রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট তাদের চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত নির্ভরতা ক্রেমলিনের 'সমতার অংশীদারিত্বের' দাবিকে একতরফা সম্পর্কে রূপ দিচ্ছে।
তবে সফরের প্রাক্কালে চীনের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় পুতিন দাবি করেন, চীন-রাশিয়া সম্পর্ক বর্তমানে একটি ‘নজিরবিহীন স্তরে’ পৌঁছেছে।
প্রমাণ হিসেবে তিনি দুই দেশের আকাশচুম্বী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং মার্কিন ডলারের পরিবর্তে প্রায় সম্পূর্ণভাবে রুবল ও ইউয়ানের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করার বিষয়টি উল্লেখ করেন।
"চলতি বছর বেইজিং ও মস্কোর কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির ৩০ বছর এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তির ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে।" — গুও জিয়াকুন, মুখপাত্র, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ডলারবিহীন লেনদেন ও 'পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২'
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ডলারবিহীন লেনদেনকে রাশিয়ার বড় একটি প্রতিরক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাশিয়ার কাছ থেকে প্রায় ৩৬৭ বিলিয়ন ডলারের জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রয় করেছে চীন।
বর্তমান সফরে দুই দেশ জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছায় কিনা, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ব বিশ্লেষকদের।
বিশেষ করে আলোচনার টেবিলে থাকা ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ নামক ১,৬০০ মাইলের প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পটি ক্রেমলিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইউরোপের হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করতে রাশিয়াকে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালি অচল হয়ে পড়ায় রাশিয়া থেকে স্থলপথে এই জ্বালানি সরবরাহ চীনের জন্য একটি নিরাপদ ও বড় বিকল্প পথ তৈরি করবে।
পশ্চিমাদের চাপ ও রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে চীনের ওপরও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আঁচ লেগেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের জেরে যুক্তরাজ্য দুটি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বেইজিং তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো শুরু থেকেই রাশিয়ার অর্থনৈতিক লাইফলাইন সচল রাখা এবং সামরিক কাজে ব্যবহার উপযোগী দ্বৈত-ব্যবহার্য সরঞ্জাম রপ্তানির জন্য বেইজিংয়ের সমালোচনা করে আসছে।
এদিকে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকে ইউক্রেন প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না হলেও, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয় যে শি জিনপিং ট্রাম্পকে বলেছিলেন, "পুতিন হয়তো এই যুদ্ধের জন্য শেষ পর্যন্ত অনুতপ্ত হতে পারেন।" যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে রাশিয়ার ভেতরে ও বাইরে চলমান সংকট যে ঘনীভূত হচ্ছে, তা এখন স্পষ্ট। সম্প্রতি সাইবেরিয়ার একজন রুশ আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষ সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হলে রাশিয়ার অর্থনীতি তা সহ্য করতে পারবে না এবং অবিলম্বে এই যুদ্ধ শেষ করা উচিত।
রাশিয়ার ভেতরের কোনো রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এমন মন্তব্য বর্তমান যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার এক বিরল ও স্পষ্ট শিকারোক্তি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
বিলুপ্ত করা হলো সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়