গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের সেই অবিশ্বাস্য ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ-ইনিংসের স্মৃতি অনেকটাই ফিরিয়ে আনলেন শাদাব খান। এক প্রান্তে সতীর্থদের আসা-যাওয়ার মিছিল, অন্য প্রান্তে একাকী লড়াই, চাপের মুখে অবিচল থেকে ব্যাট হাতে পাকিস্তানকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিলেন এই অলরাউন্ডার। শেষ উইকেটে হারিস রউফকে নিয়ে যখন জয়সূচক রানটি এলো, তখন পাকিস্তানের ডাগআউটে যেন উল্লাসের বিস্ফোরণ। কেউ উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছেন, কেউ মুষ্টিবদ্ধ হাত শূন্যে ছুড়ছেন, আবার কেউ সতীর্থদের জড়িয়ে ধরছেন। ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে প্রায় ছিটকে যাওয়া পাকিস্তান যে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে ১ উইকেটে হারাবে, এমন দৃশ্য তখন কল্পনা করাও কঠিন ছিল। কিন্তু শাদাবের ৯৬ বলে অপরাজিত ১১৩ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস আর হারিসের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন শেষ উইকেটের ৮৯ রানের জুটিতে লাহোরের ম্যাচটি হয়ে উঠলো রূপকথার গল্প।
জয়ের জন্য পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য ছিল ২৪২ রান। শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। গাস অ্যাটকিনসনের বলে ফখর জামান ১০ রান করে ফিরলে প্রথম ধাক্কা খায় দল। এরপর হেনরি ক্রোকম্বের শিকার হয়ে সাজঘরে ফেরেন সাইম আইয়ুব, আর অ্যাটকিনসনের বলে বোল্ড হয়ে যান বাবর আজম। মাত্র ৩১ রানেই তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে পাকিস্তান। উইকেটের মিছিল কিছুক্ষণের জন্য থামান সাদ বেগ। ২২ বলে ৩২ রানের ঝোড়ো ইনিংসে তিনি পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করেন। কিন্তু জেমি ওভারটনের বলে তার বিদায়ের পর পাকিস্তানের ব্যাটিং আবারও ছন্দ হারায়।
সালমান আগা ২৬ রান করে লিয়াম ডসনের বলে ফেরেন। ডসনের পরের শিকার হাসান নেওয়াজ, যিনি করেন ৩৩ বলে ১৫ রান। আরাফাত মিনহাসের বিদায়ের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপর সালমান আগা ও শাহিন শাহ আফ্রিদিও সাজঘরে ফিরলে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়ায় ১৩১ রানে ৮ উইকেট। রাজাউল্লাহ ৮ রান করে উইল জ্যাকসের শিকার হওয়ার পর ১৫৪ রানে নবম উইকেট হারায় দলটি। তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল আরও ৮৮ রান, হাতে মাত্র একটি উইকেট। অন্য প্রান্তে তখনো দাঁড়িয়ে শাদাব, কিন্তু তার সঙ্গী হিসেবে ছিলেন স্বীকৃত ব্যাটার নন, শেষ ব্যাটার হারিস রউফ। সমীকরণ কঠিন, চাপ পাহাড়সম, তবু লড়াই থেকে সরে দাঁড়াননি শাদাব।
এরপরই শুরু হয় ম্যাচের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায়। হারিসকে সঙ্গে নিয়ে শাদাব ধীরে ধীরে পাল্টে দেন পুরো ম্যাচের চিত্র। ঝুঁকি আর দায়িত্বের ভারসাম্য রেখে কখনো বাউন্ডারি, কখনো দৌড়ে রান নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখেন তিনি। শুরুতে ৫২ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করা শাদাব পরে গতি বাড়িয়ে পৌঁছে যান শতকে। ৯২ বলে তিন অঙ্ক ছোঁয়ার সময় তার ব্যাটে ছিল ১২টি চার ও চারটি ছক্কা। শেষ পর্যন্ত ৯৬ বলে ১৩টি চার ও পাঁচটি ছক্কায় অপরাজিত ১১৩ রান করেন তিনি। আর হারিস ১৯ বলে অপরাজিত ৭ রান করে অপর প্রান্ত আগলে রাখেন। শেষ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন অবিচ্ছিন্ন ৮৯ রানের জুটি, যে জুটিই পাকিস্তানকে পরাজয়ের কিনারা থেকে টেনে এনে জয় উপহার দেয়।
ইংল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লড়াই করেছেন জেমি ওভারটন। ১০ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে তিনি নেন তিন উইকেট। লিয়াম ডসন ৩০ রানে দুটি এবং গাস অ্যাটকিনসন ৬২ রানে দুটি উইকেট নেন। হেনরি ক্রোকম্ব ও উইল জ্যাকসের শিকার একটি করে উইকেট। কিন্তু শাদাবের শেষ দিকের আক্রমণ সামলানোর মতো কোনো উত্তর শেষ পর্যন্ত খুঁজে পায়নি ইংল্যান্ড। পাকিস্তানের শেষ জুটি ভাঙতে না পারার খেসারত দিতে হয় তাদের ম্যাচ হেরে।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তানের বোলারদের তোপে শুরু থেকেই বিপর্যয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভারের মধ্যেই টম ব্যান্টন, জো রুট ও অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককে হারায় তারা। ব্যান্টন ৪, রুট ৫ এবং ব্রুক মাত্র ১ রান করে ফেরেন। এরপর জর্ডান কক্সও ৬ রান করে হারিস রউফের বলে বাবর আজমের হাতে ক্যাচ দিলে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৫২ রানে ৪ উইকেট। শুরুতেই এমন ধাক্কায় বড় সংগ্রহের স্বপ্ন কঠিন হয়ে পড়ে হ্যারি ব্রুকের দলের।
সেখান থেকে ইনিংসের হাল ধরেন বেন ডাকেট। একদিকে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়েছে, অন্যদিকে ডাকেট ধৈর্য ধরে ইনিংস এগিয়ে নিয়েছেন। ১১১ বলে ১০৫ রানের ইনিংসে তিনি হাঁকান ১০টি চার ও দুটি ছক্কা। স্যাম কারানের সঙ্গে তার ৯৩ রানের জুটি ইংল্যান্ডকে বড় বিপর্যয় থেকে কিছুটা উদ্ধার করে। কারান ৫২ বলে ৪২ রান করে ফিরলেও ডাকেট চেষ্টা চালিয়ে যান। তবে তার বিদায়ের পর ইংল্যান্ডের ইনিংস আবারও দ্রুত গুটিয়ে আসে। রাজারউল্লাহ ও আরাফাত মিনহাস মাঝের ওভারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডকে চাপে রাখেন।
শেষ দিকে গাস অ্যাটকিনসনের ঝোড়ো ক্যামিও ইংল্যান্ডকে লড়াই করার মতো সংগ্রহ এনে দেয়। ২৮ বলে অপরাজিত ৩৬ রান করেন তিনি, ইনিংসে ছিল তিনটি ছক্কা। তবু তার এই প্রচেষ্টা ৫০ ওভার পর্যন্তও টেকেনি; ৪৬.৪ ওভারে ২৪১ রানেই অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। পাকিস্তানের হয়ে শাহিন শাহ আফ্রিদি ৮.৪ ওভারে ৪৬ রান দিয়ে চার উইকেট নেন। ওভারটন তিনটি উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের ইনিংসে বড় ধাক্কা দেন, আর আরাফাত মিনহাস ও রাজারউল্লাহ নেন দুটি করে উইকেট। হারিস রউফের ঝুলিতে যায় একটি উইকেট।
শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ২৪১ রান পাকিস্তানের জন্য যথেষ্ট হয়নি। ৪৭.১ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৪৩ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান, ব্যবধান মাত্র এক উইকেট। একদিকে ১৫৪ রানে ৯ উইকেট হারানোর হতাশা, অন্যদিকে শেষ উইকেটে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, এই দুই বিপরীত দৃশ্যই লাহোরের ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখবে। শাদাবের ব্যাটে শুধু একটি সেঞ্চুরি আসেনি, এসেছে চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক অনন্য গল্প। ত্রিদেশীয় সিরিজে এটি পাকিস্তানের টানা তৃতীয় জয়। অন্যদিকে এই হারের ফলে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেল ইংল্যান্ড।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
পাকিস্তান ২৪৩/৯ (৪৭.১ ওভার)
শাদাব খান ১১৩*, সাদ বেগ ৩২
জেমি ওভারটন ৩/৪৩, লিয়াম ডসন ২/৩০
ইংল্যান্ড ২৪১ (৪৬.৪ ওভার)
বেন ডাকেট ১০৫, স্যাম কারান ৪২, গাস অ্যাটকিনসন ৩৬*
শাহিন শাহ আফ্রিদি ৪/৪৬, আরাফাত মিনহাস ২/২৬, রাজারউল্লাহ ২/৩৮
ফল: পাকিস্তান ১ উইকেটে জয়ী।