কয়েক বছর ধরেই পাকিস্তানের ওয়ানডে দলের ব্যাটিং অর্ডারের মাঝের দিক নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে। বিশেষ করে ছয় নম্বর পজিশনে এমন একজন ব্যাটার খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে দলটি, যিনি বিপর্যয়ের মুখে ইনিংস সামলে দিতে পারবেন, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত রান তোলার গতিও বাড়াতে পারবেন। সেই দীর্ঘদিনের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হয়ে উঠতে পারেন হাসান নওয়াজ। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে নিজের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কিছু লক্ষণ দেখালেও ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের ইনিংস যখন ৮১ রানে চার উইকেট হারিয়ে চাপে, তখন আদিল রশিদের প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকান হাসান। এমন পরিস্থিতিতে শুরুতেই আক্রমণাত্মক শট খেলার সাহস সবার থাকে না। তার সেই ছক্কা আবারও মনে করিয়ে দেয়, স্বাভাবিকভাবেই বড় শট খেলার সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাস রয়েছে এই ডানহাতি ব্যাটারের। তবে প্রতিভার ঝলক দেখানোর পর সেটিকে নিয়মিত পারফরম্যান্সে রূপ দিতে না পারার পুরোনো সমস্যাও এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হাসানের শুরুটা ছিল একই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ও হতাশাজনক। নিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে মাত্র ৪৫ বলে অপরাজিত ১০৫ রান করেছিলেন তিনি। তার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে ২০৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় পায় পাকিস্তান। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুর অন্য চার ইনিংস মিলিয়ে তার সংগ্রহ ছিল মাত্র এক রান। বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য যে আছে, তা তিনি দেখিয়েছিলেন; কিন্তু সেই সামর্থ্য নিয়মিত কাজে লাগানোই যে আসল পরীক্ষা, সেটিও স্পষ্ট হয়ে যায়।
পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) ভালো সময় কাটিয়ে চার নম্বরে ব্যাটিংয়ে ছন্দ ফিরে পেয়েছিলেন হাসান। পরে তাকে মাঝের সারিতে খেলানোর চেষ্টা করে টিম ম্যানেজমেন্ট, কিন্তু প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা আসেনি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে কয়েকটি কম রানের ইনিংসের পর টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক দল থেকে জায়গা হারান তিনি। ওয়ানডেতে অবশ্য তার শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষেকেই ৫৪ বলে অপরাজিত ৬৩ রান করে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতেন হাসান। কঠিন উইকেটে ২৮৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৮০ রানে পাঁচ উইকেট হারানো পাকিস্তানকে জয়ের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পরের দুই ইনিংসে অপরাজিত ৩৬ ও ১৩ রান করে সফর শেষ করেন ৫৬.৫ গড়ে ১১৩ রান নিয়ে।
এমন শুরুর পরও টি-টোয়েন্টিতে তার সমস্যার সমাধান হয়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাত্র একটি ওয়ানডে খেলার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আবারও দূরে সরে যেতে হয় তাকে। পরে ২০২৫-২৬ মৌসুমের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি লিগে ১০ ইনিংসে মাত্র ১২৪ রান করেন হাসান। সেখানে মূলত ইনিংসের শেষ দিকে দ্রুত রান তোলার দায়িত্বে খেলতে গিয়ে তার সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। বড় শট খেলার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না; বরং বড় শটের আগে কীভাবে ইনিংস গড়তে হবে, সেটিই হয়ে উঠেছিল মূল বিষয়।
এই জায়গায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত আসে ন্যাশনাল টি-টোয়েন্টি কাপে শিয়ালকোটের হয়ে খেলার সময়। দলের প্রধান কোচ নাভিদ লতিফ তাকে শুরুতে কিছুটা সংযত থেকে পরে ইনিংসের গতি বাড়ানোর পরামর্শ দেন। হাসান সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন, তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৫৫। মুলতানের বিপক্ষে কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল হয়ে ওঠা ম্যাচে প্রথমে ২১ রান করতে ২১ বল খেললেও পরে মাত্র ১৯ বলে ৫৯ রান করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪০ বলে অপরাজিত ৮০ রানের ইনিংস খেলেন। ধৈর্য ধরে শুরু করার পরও যে বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই ম্যাচে তার প্রমাণ দেন হাসান।
তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে সফল হওয়া কৌশল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে একইভাবে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। শুরুতে বেশি সময় নিয়ে ফেললে পরে রান তোলার চাপ বাড়ে, আর তখন আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে উইকেট হারানোর ঝুঁকিও থাকে। এশিয়ান গেমসে ভারতের বিপক্ষে ৫১ বলে ৯৬ রানের ইনিংসে হাসান এই সমস্যার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দেখিয়েছিলেন। প্রথম ১১ বলে মাত্র ছয় রান করার পরও ইনিংসের শেষ দিকে গতি বাড়ান তিনি। ভারতের ফিল্ডিংয়ের ভুল তার কাজে এলেও সুযোগ কাজে লাগানোর কৃতিত্ব হাসানকেই দিতে হয়। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে নয় বলে অপরাজিত ১৯ রান করে দলকে শেষ দিকে গতি এনে দেন। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচে ১৬ বলে ১৭ রানের ইনিংস আবারও দেখিয়েছে, নতুন কৌশল এখনো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
ওয়ানডেতেই অবশ্য পাকিস্তানের জন্য হাসানের বিকশিত হয়ে ওঠার সুযোগটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে পাঁচ নম্বরে সালমান আলী আগা মোটামুটি নির্ভরযোগ্য থাকলেও তার পরের পজিশনটি স্থায়ীভাবে কারও দখলে নেই। ছয় নম্বরে একাধিক ব্যাটারকে পরীক্ষা করেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পায়নি পাকিস্তান। এই পজিশনে কখনো ভেঙে পড়া ইনিংস সামলাতে হয়, কখনো উইকেট বাঁচিয়ে স্ট্রাইক ঘোরাতে হয়, আবার কখনো হাতে অল্প কয়েক ওভার থাকতেই দ্রুত রান তুলতে হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়ার এই দক্ষতাই ছয় নম্বর ব্যাটারের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
চলতি বছর ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস কাপে পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং করে তিন ম্যাচের মধ্যে দুটিতে অর্ধশতক করেছিলেন হাসান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজে তার ৭৪ বলে ৭৯ রানের ইনিংসও সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। এর আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৪০ বলে অপরাজিত ২২ রান করার পর শেষ পর্যন্ত ৪৯ বলে ৩৭ রানে আউট হন তিনি। ওই ইনিংসে স্ট্রাইক ঘোরাতে তার সমস্যা হচ্ছিল, ফলে ধৈর্য ধরে খেলার নতুন কৌশল উল্টো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৬ বলে অর্ধশতক তুলে নিয়ে হাসান দেখিয়েছেন, সতর্কভাবে শুরু করেও আক্রমণের সঠিক সময় বেছে নেওয়া সম্ভব।
ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে হাসান বলেন, নিজের খেলায় নিয়মিত উন্নতি আনার চেষ্টা করা উচিত। বড় দলের বিপক্ষে পারফর্ম করেই একজন ক্রিকেটার নিজের পরিচিতি তৈরি করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টার কথাও জানিয়েছেন এই ব্যাটার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জেমি ওভারটনের বলে আউট হওয়ার প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ফিটনেস নিয়ে আরও কাজ করা প্রয়োজন। তার মতে, তখন প্রতিক্রিয়ার গতি কিছুটা কমে গিয়েছিল; অথচ একই ধরনের বল এর আগে সামলাতে পেরেছিলেন তিনি। ৭৯ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পরও নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করার এই মানসিকতা তার জন্য ইতিবাচক দিক।
তবে কয়েকটি ভালো ইনিংস দেখেই হাসানকে পাকিস্তানের সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিজ্ঞতা এখনো সীমিত, আর ধারাবাহিক চাপের মধ্যে সাম্প্রতিক উন্নতি কতটা ধরে রাখতে পারবেন, সেটিও পরীক্ষিত নয়। কখনো টাইমিং হারাতে পারেন, কখনো দ্রুত রান তুলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু এমন ঝুঁকি এড়াতে গিয়ে তাকে বারবার ফরম্যাট, ব্যাটিং পজিশন ও ভূমিকা বদলে খেলালে তার উন্নতির ধারাও ব্যাহত হতে পারে।
পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্ট যদি মনে করে ছয় নম্বরে সফল হওয়ার মতো সামর্থ্য হাসানের রয়েছে, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট ভূমিকা দিয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। মাঝেমধ্যে ব্যর্থ হলেও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার সময় ও সহায়তা প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই ওপেনার হিসেবে খেলা শুরু করা হাসান এখন ইনিংসের মাঝের ওভারগুলো সামলানো, পরিস্থিতি বুঝে গতি বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আক্রমণাত্মক হওয়ার কৌশল শিখছেন। বড় শট খেলার ক্ষমতা তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখলেও পাকিস্তানের জন্য তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে এই কম আলোচিত দক্ষতাগুলো কতটা আয়ত্ত করতে পারেন, তার ওপর।
হাসান নওয়াজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে আশার জায়গা রয়েছে, বিশেষ করে ওয়ানডেতে। তবে প্রতিভার ঝলককে নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্সে পরিণত করতে হলে তাকে ধারাবাহিক হতে হবে। পাকিস্তানের মাঝের সারির দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটাতে তিনি কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু সে জন্য প্রয়োজন সময়, স্থায়ী ভূমিকা এবং নিজের ভুল থেকে শেখার সুযোগ। সম্ভাবনার ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন; এবার সেই সম্ভাবনাকে নিয়মিত সাফল্যে রূপ দেওয়াই তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সূত্র: ডন
কানাডাকে উড়িয়ে বাংলাদেশের শুভসূচনা
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে প্রশংসায় ভাসছে আনভীর স্টেডিয়াম
ব্রুকের রেকর্ডের দিনে লঙ্কানদের মহাকাব্যিক জয়
ওয়ানডেতে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন হ্যারি ব্রুক