কারখানা থেকে বিশ্বকাপ মঞ্চে ডেনিজ উন্ডাভের উত্থান

একসময় যাকে নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছিলেন কোচ, এখন সেই ডেনিজ উন্ডাভই হয়ে উঠছেন জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযানের অন্যতম বড় ভরসা।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে নাটকীয় ২-১ গোলের জয়ে বদলি হিসেবে নেমে জোড়া গোল করেন উন্ডাভ। তার দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ২০১৪ সালে শিরোপা জয়ের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে জার্মানি।

চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুটি ম্যাচেই বেঞ্চ থেকে নেমেছেন ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। কিন্তু তাতেই তিন গোল ও দুই অ্যাসিস্ট করে ফেলেছেন। অর্থাৎ পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এত বেশি গোল-অবদান রাখার কীর্তি আগে ছিল শুধু ক্যামেরুন কিংবদন্তি রজার মিলা'র। তবে কয়েক মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল একেবারে ভিন্ন।

মার্চে ঘানার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল করার পর উন্ডাভ জাতীয় দলে নিয়মিত একাদশে জায়গা পাওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। সেই মন্তব্য ভালোভাবে নেননি কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান। তিনি বলেছিলেন, উন্ডাভ নিজের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছেন। এমনকি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শুরু থেকে খেললে হয়তো ওই গোলও করতে পারতেন না তিনি। পরে অবশ্য সেই মন্তব্যের জন্য উন্ডাভের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন জার্মান কোচ।

এরপর আর কথার জবাব কথায় দেননি উন্ডাভ। উত্তর দিয়েছেন মাঠে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১১ ম্যাচে নিজের গোলসংখ্যা বাড়িয়ে করেছেন ৯। এখন জার্মানির শেষ গ্রুপ ম্যাচে একাদশে জায়গা পাওয়ার দাবিও জোরালো করেছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে নাগেলসমান বলেন, 'কেন আমি তার ছন্দ নষ্ট করব? দুই ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দুই ম্যাচেই গোল করেছে সে। শুরু করার সুযোগ অবশ্যই তার আছে।'

উন্ডাভের গল্পটা আরও বেশি অনুপ্রেরণার কারণ তার অতীত। ১৪ বছর বয়সে তাকে ছেড়ে দেয় জার্মান ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেন। বলা হয়েছিল, শারীরিক গঠন যথেষ্ট নয়, বড় ফুটবলার হওয়ার সম্ভাবনাও কম। সেই প্রত্যাখ্যান ভেঙে দিয়েছিল কিশোর উন্ডাভকে। কিন্তু হাল ছাড়েননি উন্ডাভ।

১৭ বছর বয়সে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। সপ্তাহে মাত্র ১২০ পাউন্ড আয় হতো ফুটবল থেকে। বেঁচে থাকার জন্য দিনে আট ঘণ্টা কারখানায় লেজার মেশিন অপারেটরের কাজও করতে হতো।

এক সাক্ষাৎকারে উন্ডাভ বলেন, 'ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠতাম। কারখানায় কাজ করতাম, এরপর অনুশীলনে যেতাম। রাত আটটার দিকে বাসায় ফিরতাম। পরদিন আবার একই রুটিন। শুধু ফুটবলের টাকায় জীবন চলত না বলেই কাজ করতে হয়েছিল।'

সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়ে ২০২০ সালে বেলজিয়ামের ইউনিয়ন সাঁ-জিলোয়াজে যোগ দেন তিনি। পরে ব্রাইটনে সুযোগ পেলেও খুব বেশি সফল হতে পারেননি। এরপর স্টুটগার্টে গিয়ে বদলে যায় ক্যারিয়ার। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯ গোল করে বিশ্বকাপ দলে জায়গা নিশ্চিত করেন।

বর্তমানে জার্মানির আক্রমণভাগে কাই হাভার্টজকে এগিয়ে রাখলেও উন্ডাভের ফর্ম নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নাগেলসমানের ভাষায়, 'খেলা যখন উন্মুক্ত হয়, তখন উন্ডাভ অসাধারণ। বিশ্বকাপের জন্য সে নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।' আর উন্ডাভ? ব্যক্তিগত পুরস্কার হাতে নিয়েও তার চোখ ছিল দলের সাফল্যে।

'দারুণ অনুভূতি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে উঠেছি। এখন দেখা যাক সামনে কী হয়,' বলেন তিনি।

কারখানার মেঝে থেকে বিশ্বকাপের আলোয় উঠে আসা উন্ডাভ এখন জার্মানির নতুন স্বপ্নের নাম। পাঁচ নম্বর বিশ্বকাপ শিরোপার খোঁজে থাকা দলটির জন্য তিনি হয়তো হয়ে উঠতে পারেন সবচেয়ে বড় চমক। সূত্র: আলজাজিরা