আন্তোয়ান সেমেনিয়ো (Antoine Semenyo) ঘানায় প্রতিনিধিত্বকারী একজন পেশাদার ফুটবলার যিনি ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি এবং ঘানা জাতীয় দলের হয়ে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলেন। লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা এই ফরোয়ার্ড তাঁর ক্ষিপ্রগতি, ড্রিবলিং এবং গোল করার দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।
যখন আন্তোয়ান সেমেনিয়ো বোর্নমাউথে সই করেন, তিনি লিডস ইউনাইটেডের প্রাক্তন ম্যানেজার ডেভিড হকাডেকে এক বোতল শ্যাম্পেন পাঠিয়েছিলেন। এক অদ্ভুত জুটি মনে হলেও সেমেনিয়োর আজকের এই শীর্ষ পর্যায়ে উঠে আসার নেপথ্যের মূল কারিগর হকাডেই। সেই বোতলের লেবেলে লেখা ছিল দুটি শব্দ "ক্ষুধা এবং বিশ্বাস"। কিশোর বয়সে এই কথাগুলো সেমেনিয়োর মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের মুহূর্তেও তিনি তাঁর মেন্টরকে এই মন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিতে ভুলেননি।
তবে শীর্ষের এই পথটি সেমেনিয়োর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। অ্যাকাডেমির ব্যর্থ ট্রায়াল, নন-লিগ ফুটবল খেলার জন্য ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠা, এমনকি খেলাধুলা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার চিন্তার মতো কঠিন সময় পার করে আজ ২৬ বছর বয়সে তিনি পৌঁছে গেছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে, যেখানে তাঁর দেশ ঘানা মুখোমুখি হবে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের। এক বিনয়ী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষের অদম্য মনোবল এবং হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের বিশ্বাসের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে তাঁর এই অসাধারণ উত্থানের রূপকথা।
লন্ডনে জন্ম নেওয়া সেমেনিয়োর বাবা-মা ল্যারি ও ডেলা ছিলেন ঘানার নাগরিক। সেমেনিয়ো এবং তার ভাই জাই গ্রিনিচে বড় হয়েছেন, যেখানে বল যেন সবসময় তাদের পায়ের সাথেই লেগে থাকত। সেমেনিয়ো যে এখন তার ডান ও বাম দুই পায়েই সমান পারদর্শী, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ তার বাবা, যিনি ঘানার শীর্ষ লীগে টনি ইয়েবোয়ার সাথে খেলেছেন, তাকে ছোটবেলা থেকেই দুই পায়ে "কাগজ, ক্যান, যেকোনো কিছু" লাথি মারতে উৎসাহিত করতেন। ফলে ছয় বছর বয়সের মধ্যেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা সেমেনিয়োর কাছে এটি স্বাভাবিক হয়ে যায়। তার প্রতিভা বাবা-মায়ের নজরে এলে তারা তাকে উৎসাহিত করেন এবং ১৫ বছর বয়সে ক্রিস্টাল প্যালেসে আট সপ্তাহের ট্রায়ালের আগে তাকে আর্সেনাল, টটেনহ্যাম হটস্পার এবং মিলওয়ালে ট্রায়ালের জন্য পাঠান। কিন্তু সেই পথগুলোর কোনোটিই সফল হয়নি। ফলস্বরূপ ১৬ বছর বয়সে চরম হতাশ ও মোহমুক্ত হয়ে ফুটবল পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সেমেনিয়ো।
ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর জীবনে আগমন ঘটে হকাডের। বিশাম অ্যাবেতে অন্য প্রতিযোগীদের সাথে নিজের ফিটনেস যাচাইয়ের জন্য এক ট্রায়াল সেশনে গিয়েছিলেন সেমেনিয়ো। ফরেস্ট গ্রিন রোভার্সের প্রাক্তন বস হকাডে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁকে ট্রায়ালটি পর্যবেক্ষণের অনুরোধ করা হয়। হকাডে বিবিসি স্পোর্টকে জানান, প্রথম দেখায় সেমেনিয়োকে ভীষণ দিশেহারা মনে হয়েছিল, তার কথাবার্তাও ছিল তেমন এবং চোখে ছিল এক শূন্যতা।
ট্রায়ালের তালিকায় সেমেনিয়োর নাম না দেখে অবাক হয়ে হকাডে তাঁর মধ্যে এক দারুণ সম্ভাবনা দেখতে পান, যে কোনো চিন্তা ছাড়াই দুই পায়ে ফুটবল সামলাতে পারত। সেমেনিয়োর কাঁধ দুটো মজবুত ছিল এবং সঠিক পরিবেশে সে একজন অসাধারণ খেলোয়াড় হয়ে উঠবে বলে হকাডে বিশ্বাস করেছিলেন। এরপর হকাডে সেমেনিয়োর বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করে ছেলেটিকে নিজের দায়িত্বে নেন।
হকাডে সেমেনিয়োকে সাউথ গ্লস্টারশায়ার অ্যান্ড স্ট্রাউড (এসজিএস) কলেজে তাঁর দলে নিয়ে আসেন, যারা সাউথ ওয়েস্ট কাউন্টিজ লিগে খেলত। শনিবার ভোর ৫টায় সুইনডনের এক মেস থেকে সেমেনিয়োকে নিজের গাড়িতে করে ম্যাচে নিয়ে যেতেন হকাডে। সেই ভোরবেলার যাত্রায় হকাডের দেওয়া দুটি মূল শব্দ—ক্ষুধা ও বিশ্বাস—দ্রুতই সেমেনিয়োর জীবনের মন্ত্রে পরিণত হয়। প্রথম মৌসুমটি তাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে সাহায্য করেছিল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের সেরা নন-লিগ খেলোয়াড়রা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। শারীরিক বৃদ্ধির সাথে সাথে সে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয় এবং দুর্দান্ত গতিতে উন্নতি করতে থাকে। পরের মৌসুমে সে এসজিএস-এ পূর্ণকালীনভাবে যোগ দেয় এবং প্রাক-মৌসুমে বেশ কয়েকটি পেশাদার দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলে সবার নজর কাড়ে, ফলে প্রতিটি দলই তাকে চুক্তিবদ্ধ করতে আগ্রহ দেখায়।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সেমেনিয়ো ব্রিস্টল সিটির সাথে প্রথম পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তবে মাত্র ১৮ বছর বয়স হওয়ায় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাঁকে সাথে সাথেই নন-লিগ দল বাথ সিটিতে ধারে পাঠানো হয়। তৎকালীন কোচ জেরি গিল তাঁকে উইংয়ে খেলান এবং পুরুষদের ফুটবলের শারীরিক শক্তির সাথে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল শেখান। এরপর তিনি লিগ টু-এর দল নিউপোর্ট কাউন্টিতে ধারে যান, যেখানে ২০১৮-১৯ মৌসুমের প্রথমার্ধে ২১টি ম্যাচে ৩টি গোল করেন।
এফএ কাপে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে প্রিমিয়ার লিগের দল চেলসির সাথেও তাঁর নাম জড়ায়, যার ফলে ব্রিস্টল সিটি তাঁকে ফিরিয়ে আনে। তবে ব্রিস্টল সিটিতে ফেরার পর শুরুটা ভালো হয়নি। ২০১৯ সালের মার্চে লিডসের বিপক্ষে প্রথম শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে এক ঘণ্টার মধ্যেই উঠে যেতে হয় তাঁকে। এক মাস পর ডার্বির বিরুদ্ধে বদলি হিসেবে নেমে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এরপর লিগ ওয়ানের দল সান্ডারল্যান্ডে ধারে খেলতে গিয়েও হতাশাজনক সময় কাটে তাঁর।
অবশেষে নাইজেল পিয়ারসন ব্রিস্টল সিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্লাবের বেতন কাঠামো ছাঁটাইয়ের কারণে তরুণদের সুযোগ দিতে শুরু করেন। সেমেনিয়ো ও বোর্নমাউথের বর্তমান মিডফিল্ডার অ্যালেক্স স্কট হয়ে ওঠেন দলের প্রধান ভরসা। ব্র্যাডফোর্ড সিটির প্রাক্তন খেলোয়াড় নাহকি ওয়েলস সেমেনিয়োর মেন্টর বা বড় ভাইয়ের ভূমিকা পালন করেন এবং তার ভেতরের গতি ও ক্ষমতাকে বিকশিত করতে সাহায্য করেন। এর ফলও মেলে হাতেনাতে; ২০২১-২২ মৌসুমে ৮টি গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে ৮টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। ছয় বছর আগে যে ক্রিস্টাল প্যালেস তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা সহ সাউদাম্পটন তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। অবশেষে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সাড়ে চার বছরের চুক্তিতে বোর্নমাউথে যোগ দিয়ে প্রিমিয়ার লিগে পা রাখেন সেমেনিয়ো।
বোর্নমাউথের কোচ আন্দোনি ইরাওলার হাই-প্রেসিং ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠেন তিনি এবং ক্লাবের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১১০ ম্যাচে ৩২টি গোল এবং ১৩টি অ্যাসিস্ট করেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমের প্রথমার্ধে তাঁর করা ১০টি গোল বিশ্বখ্যাত ম্যানেজার পেপ গার্দিওলার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলস্বরূপ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রেকর্ড ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন সেমেনিয়ো, যা তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরকে চিহ্নিত করে। সিটির হয়ে বাকি মরসুমে তিনি ১১টি গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করেন।
ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত এফএ কাপের ফাইনালে চেলসির বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে সিটিকে শিরোপা এনে দিয়ে ঘরোয়া মৌসুম শেষ করেন তিনি। ঘানার হয়ে বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে তার এই অবিশ্বাস্য উত্থান নিয়ে মেন্টর হকাডে গর্বিত চিত্তে বলেন, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি আন্তোয়ানকে বলতেন কাউকে ভুল প্রমাণ করার দরকার নেই, বরং নিজেকে এবং তাকে সঠিক প্রমাণ করতে। সেমেনিয়ো আজ ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছেন এবং এত সাফল্যের পরও তিনি আগের মতোই বিনয়ী ও একজন ভালো মানুষ হিসেবে রয়ে গেছেন।
সূত্র: বিবিসি