বিজ্ঞান জগতেও নিজের নামের অনন্য স্বীকৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করলেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি ফুটবল মাঠে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন লিওনেল মেসি। এবার বিজ্ঞানের জগতেও নিজের নামের অনন্য স্বীকৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করলেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। তার নামে নামকরণ করা প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়ে। পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় আবিষ্কৃত একটি নতুন উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে ‘সালভিয়া মেসি’ (Salvia messii)। এর মধ্য দিয়ে নিজের গড়া গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেছেন মেসি।
নতুন এই উদ্ভিদটি আবিষ্কারের আগে মেসির নামে পাঁচটি প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে একটি টিকটিকি, একটি মাকড়সা, দুটি জীবাশ্ম প্রজাতি এবং একটি ছত্রাক। নতুন উদ্ভিদটি যুক্ত হওয়ায় তালিকায় জায়গা পেয়েছে প্রাণী, জীবাশ্ম, ছত্রাক ও উদ্ভিদ- বিভিন্ন ধরনের প্রজাতি।
তবে নতুন এই স্বীকৃতির পাশাপাশি উদ্বেগের বিষয়ও রয়েছে। গবেষকেরা ‘সালভিয়া মেসি’কে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ, মেসির নামে নামকরণ করা এই উদ্ভিদটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
‘সালভিয়া মেসি’ হলো একধরনের সেজ বা ঔষধি উদ্ভিদ, যা পেরুর মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের আন্দিজ পর্বতমালায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় পাথুরে ও শুষ্ক ঢালু এলাকায় এর দেখা মেলে। উদ্ভিদটি মিন্ট বা পুদিনা পরিবারের সদস্য। এই পরিবারের কিছু উদ্ভিদ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহবিরোধী ও জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত।
নতুন উদ্ভিদটি প্রায় দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর ফুলের রং হালকা নীল ও সাদা। আর্জেন্টিনার জাতীয় রঙের সঙ্গে ফুলের এই রঙের মিল থাকায় মেসির নামে উদ্ভিদটির নামকরণ বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা ফুটবলারের সঙ্গে দেশটির জাতীয় পরিচয়ের এই যোগসূত্র নামকরণটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বৈজ্ঞানিক নামকরণের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে, অনেক সময় কোনো ব্যক্তির পদবি লাতিন রূপে ব্যবহার করে নতুন প্রজাতির নাম রাখা হয়। ‘মেসি’ পদবির সঙ্গে ‘i’ যুক্ত হওয়ায় ‘Salvia messii’ নামটির অর্থ দাঁড়ায় ‘মেসির সেজ’।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সান মার্কোসের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের পল গনজালেসের নেতৃত্বে গবেষকেরা উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেন। এই গবেষণায় তার সঙ্গে ছিলেন আর্জেন্টিনার গবেষক রোলান্দো উরিয়া এবং হুয়ারাঙ্গো নেচারের জীববিজ্ঞানী জ্যঁ কাপচা-রামোস। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে উদ্ভিদবিষয়ক সাময়িকী পাইটোটাক্সা (Phytotaxa)-এর অক্টোবর সংখ্যায়।
উদ্ভিদটির নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি আবিষ্কারকে শুধু একজন ফুটবলারের নামে নামকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ না করা গেলে প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
মেসির নামে ছয় প্রজাতি
২০২৪ সালের মে মাসে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস মেসিকে সেই ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার নামে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে। তখন তার নামে নামকরণ করা প্রজাতির সংখ্যা ছিল পাঁচ। ২০২৬ সালে ‘সালভিয়া মেসি’ যুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে ছয়।
মেসির নামে নামকরণ করা ছয়টি প্রজাতির তালিকা নিচে দেওয়া হলো
তালিকাটি দেখায়, মেসির নাম শুধু বর্তমানে জীবিত প্রাণী বা উদ্ভিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবাশ্ম প্রজাতির নামেও তার পদবি যুক্ত হয়েছে। জীবাশ্ম ব্র্যাকিওপড ও কনডর- দুটিই সেই উদাহরণ।
এবার নতুন উদ্ভিদ যুক্ত হওয়ায় মেসির নামে নামকরণ করা প্রজাতির বৈচিত্র্য আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে এটি তুলে ধরেছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নতুন প্রজাতি শনাক্ত ও শ্রেণিবদ্ধ করার সময় গবেষকেরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তিদের নামও বেছে নেন।
মেসির বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও ফুটবল-উত্তরাধিকার
মেসির নামে প্রজাতির নামকরণ কোনো একক পুরস্কার বা আনুষ্ঠানিক প্রচারণার ফল নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে গবেষকেরা তার প্রভাব ও পরিচিতিকে সম্মান জানাতে নিজেদের আবিষ্কৃত প্রজাতির নামের সঙ্গে তার নাম যুক্ত করেছেন। নতুন উদ্ভিদটির ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার জাতীয় রঙের সঙ্গে ফুলের মিলও এই নামকরণকে বিশেষ অর্থ দিয়েছে। যদিও উদ্ভিদটি আর্জেন্টিনায় নয়, পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় জন্মায়।
ফুটবল মাঠেও মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নানা উল্লেখযোগ্য অর্জনে সমৃদ্ধ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে সিনিয়র পর্যায়ে অভিষেক হয় তার। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সাময়িক অবসরের ঘোষণা দিলেও পরে ফিরে আসেন জাতীয় দলে। এরপর আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে একাধিক বড় সাফল্য এনে দেন তিনি।
মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের শিরোপাও জেতে দলটি। জাতীয় দলের হয়ে তার নামের পাশে রয়েছে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল। আটবার ব্যালন ডি’অর জেতার কৃতিত্বও রয়েছে তার।
চলতি মাসের শুরুতে বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করেছিলেন মেসি। তার বয়স এখন ৩৯ বছর। ক্লাব ফুটবলে তিনি ইন্টার মিয়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের জন্য ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও তার নাম রয়েছে।
শুধু মেসি নন, বিজ্ঞানের জগতে জায়গা পেয়েছেন অন্য ফুটবলাররাও
বিভিন্ন প্রজাতির নামকরণে ফুটবলারদের সম্মান জানানোর ঘটনা মেসির রেকর্ডের আগেও ঘটেছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে গবেষকেরা ব্রাজিলের ১৯৫৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের নামে নতুন শনাক্ত করা ১২টি মাইক্রোক্যাডিসফ্লাই প্রজাতির নাম রাখেন। তাদের মধ্যে ছিলেন কিংবদন্তি পেলে। তার নাম অনুসারে একটি প্রজাতির নাম রাখা হয় Neotrichia pelei।
আর্জেন্টিনার আরেক কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার নামেও একাধিক জীবের নামকরণ হয়েছে। তার নামে নাম পাওয়া প্রজাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি জীবাশ্ম ড্যামসেলফ্লাই, একটি পরজীবী ফ্লুক এবং একটি সামুদ্রিক শামুক।
ম্যারাডোনার নামে নামকরণ করা আরেকটি প্রজাতি ছিল Anaphes maradonae নামের একটি পরী-বোলতা। তবে পরে গবেষকেরা দেখতে পান, এটি আগে নামকরণ করা অন্য একটি বোলতা প্রজাতিরই সমতুল্য। ফলে এটিকে আর স্বতন্ত্র বৈধ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
মেসির নামে ছয়টি প্রজাতির নামকরণের বিষয়টি তাকে বিজ্ঞানের জগতেও একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে নিয়ে গেছে। তবে সর্বশেষ এই স্বীকৃতির গুরুত্ব শুধু রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। ‘সালভিয়া মেসি’ এমন একটি উদ্ভিদ, যার অস্তিত্ব হুমকির মুখে। ফলে এর নামকরণ একদিকে যেমন মেসির প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ, অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতিতে এখনো শনাক্ত হতে থাকা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।