জাপানে রেলস্টেশনে নীল আলো 

রঙ বদলেই বাঁচলো হাজারো প্রাণ

সামান্য একটি রঙের পরিবর্তন যে মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, তার অনন্য দৃষ্টান্ত জাপান। টোকিওর কিছু মেট্রো স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে বাতিগুলোর রঙ সাধারণ সাদা বা হলুদ থেকে বদলে ‘নীল এলইডি’ (Blue LED) আলো লাগানো হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—রেললাইনে আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো। এই নীল আলো বসানোর পর থেকে স্টেশনগুলোতে আত্মহত্যার ঘটনা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে, জাপানের কথাটা আলাদা করে বলতেই হয়। একুশ শতাব্দী আসার আগে থেকেই আত্মহত্যার সমস্যার সঙ্গে লড়ছে এই দ্বীপরাষ্ট্র। ১৯৯৭ সালেই, জাপানে আত্মহত্যার হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এরপর থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল আত্মহত্যার হার। তবে, এরপরই চাকাটা উল্টোদিকে ঘুরে গিয়েছে। ২০১৯-এ তো, সেই দেশে ১৯৭৮ সালের পর থেকে সবথেকে কমে নেমে গিয়েছিল আত্মহত্যার হার। পরের কয়েক বছরের পরিসংখ্যান, কোভিড মহামারি ঘেঁটে দিলেও, এখনও তুলনামূলকভাবে আত্মহত্যার সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণেই রাখতে পেরেছে জাপান। কীভাবে সম্ভব হল এটা? জাপানের অনেকের দাবি, ওষুধ একটাই - নীল আলো।

কেন এই নীল আলো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীল রঙের একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। এটি মানুষের মনে প্রশান্তি আনে এবং উত্তেজনার মুহূর্তে মস্তিষ্ককে শান্ত করতে সাহায্য করে।

japan

যারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন, নীল আলো তাদের অবচেতন মনে এক ধরণের ‘ধাক্কা’ (Nudge) দেয় বা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। এটি আবেগের লাগাম টানতে সাহায্য করে। নীল রঙ আকাশ ও সমুদ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা মানুষের স্নায়ুর ওপর ইতিবাচক ও ধীরস্থির প্রভাব ফেলে।

পরিসংখ্যান কী বলছে
২০০৯ সালে ‘ইস্ট জাপান রেলওয়ে কোম্পানি’ প্রথমবারের মতো টোকিওর ব্যস্ততম ইয়ামানোতে (Yamanote) লাইনের স্টেশনগুলোতে এই বিশেষ আলো বসায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নীল আলো স্থাপনের পর ওই স্টেশনগুলোতে আত্মহত্যার হার প্রায় ৮৪ শতাংশ কমে গেছে। যদিও কিছু গবেষক মনে করেন দিনের আলোতে এর প্রভাব কম, তবুও রাতের বেলায় বা অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে এটি অত্যন্ত কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

জাপানের এই সাফল্যের পর স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহর এবং ইংল্যান্ডের গ্যাটউইক স্টেশনেও (Gatwick Station) একই ধরনের নীল আলো ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। সেখানে শুধু আত্মহত্যা নয়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমাতেও এই আলো ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

japan-1

জাপানের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির জটিল সমাধান নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে নেওয়া ছোট একটি পদক্ষেপও হাজারো প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম।

আত্মহত্যার মোকাবিলায় নীল আলো কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিতভাবে না জানা গেলেও, জাপানি ট্রেন ব্যবস্থাগুলিকে মসৃণভাবে চালানোর ক্ষেত্রে নীল আলোর একটা বড় ভূমিকা থাকতে পারে। শুধু নীল আলো নয়, আরও বিভিন্ন ‘নাজ স্ট্র্যাটেজি’ ব্যবহার করে থাকে জাপান। যেমন, প্রস্থানের সংকেত হিসেবে কোনো রূঢ় আওয়াজ নয়, শান্ত সুর ব্যবহার করা হয়। যার ফলে, যাত্রীদের অযথা তাড়াহুড়ো করে না, ধাক্কাধাক্কি করে না। দুর্ঘটনা বা সংঘাতের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে।